নিজস্ব প্রতিনিধি | কলকাতা | ২৭ মার্চ, ২০২৬
২০১১ সালে যে ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর স্লোগান দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছিল, ১৫ বছর পর ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB)-র পরিসংখ্যান সেই স্লোগানকেই বাংলার নারীদের জন্য এক ভয়াবহ পরিহাস হিসেবে তুলে ধরেছে। বামফ্রন্ট জমানার শান্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা ধ্বংস করে গত দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে উঠেছে নারী শিকারিদের অবাধ বিচরণভূমি। সরকারি তথ্যই বলছে, ২০১১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত রাজ্যে নারী নির্যাতনের নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা ৩ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে।
৩ লক্ষ কান্না: এক দশকের কালপঞ্জি
এনসিআরবি-র তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূল জমানার শুরু থেকেই নারীদের নিরাপত্তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ২০১১ সালেই রাজ্যে নারী নির্যাতনের মামলা ছিল ২৯,১৩৩টি—যা ছিল গোটা দেশের মোট ঘটনার প্রায় ১৩ শতাংশ। ২০১৮ সালের পর থেকে এই গ্রাফ আর নিচে নামেনি; প্রতি বছর গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার নারী নির্যাতনের মামলা দায়ের হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ৩ লক্ষ সংখ্যাটি হিমশৈলের চূড়ামাত্র। কারণ, তৃণমূলের ‘ভয় ও দাদাগিরির’ রাজনীতিতে সিংহভাগ অপরাধ থানায় পৌঁছতেই পারে না। পুলিশ এখানে নিরপেক্ষ রক্ষক নয়, বরং শাসকদলের ক্যাডার বাহিনীতে পরিণত হয়েছে।
অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য: সাজার হার মাত্র ৫%
পরিসংখ্যানের সবচেয়ে লজ্জাজনক দিক হলো অপরাধীদের দায়মুক্তি। পশ্চিমবঙ্গে নারী নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৫ শতাংশ, যা সারা দেশে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।
কেন এই দায়মুক্তি? বামপন্থী নেতৃত্ব বারবার অভিযোগ তুলেছেন যে, ধর্ষক বা নির্যাতনকারী যদি শাসকদলের ঝাণ্ডা ধরে থাকে, তবে পুলিশ চার্জশিট দুর্বল করে দেয়।
প্রমাণ লোপাটের সংস্কৃতি: কামদুনি থেকে আরজি কর—প্রতিটি ঘটনায় দেখা গেছে, পুলিশ অপরাধীকে আড়াল করতে বা তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করতে অতি সক্রিয়। যখন রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন ৫ শতাংশ সাজার হার অস্বাভাবিক কিছু নয়।
কামদুনি থেকে আরজি কর: একটি অবিচ্ছিন্ন অন্ধকার
গত ১৫ বছরে বাংলার ল্যান্ডস্কেপ বদলে গেছে অপরাধের ধরনে। ২০১৩-তে কামদুনির সেই নৃশংসতা থেকে ২০২৪-এর আরজি কর মেডিকেল কলেজের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা—শাসকদলের প্রশ্রয়ে অপরাধীদের দুঃসাহস আকাশ ছুঁয়েছে।
"তৃণমূল জমানায় অপরাধের কোনো বিচার হয় না, হয় শুধু 'ক্ষতিপূরণ' দিয়ে মুখ বন্ধ করার রাজনীতি। বিচার চাইতে পথে নামলে জোটে পুলিশের লাঠি আর শাসানি।" — রাজ্যের এক প্রাক্তন বাম বিধায়কের মন্তব্য।
১৫ বছরের বিভীষিকা: এক নজরে পরিসংখ্যান
| সাল | মামলার সংখ্যা (প্রায়) | মন্তব্য |
| ২০১১ | ২৯,১৩৩ | পরিবর্তনের শুরুতেই বিপর্যয় |
| ২০১৮ | ৩০,৩৯১ | ধারাবাহিকভাবে দেশের শীর্ষ চার-এ |
| ২০২০ | ৩৬,৪৩৯ | উত্তরপ্রদেশের পরেই বাংলার স্থান |
| ২০২৩ | ৩৪,৬৯১ | অরাজকতার চূড়ান্ত রূপ |
| মোট (১১-২৩) | ৩,০০,০০০+ | নথিভুক্ত মামলার হাড়হিম করা সত্য |
আমাদের দাবি: চাই শুধু নিরাপত্তা নয়, চাই বিচার
সিপিআই(এম) এবং বামপন্থী সংগঠনগুলো শুরু থেকেই বলে আসছে, নারীর নিরাপত্তা কোনো দয়ার দান নয়, এটি সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু তৃণমূলের আমলাতান্ত্রিক ও পুলিশি কাঠামো অপরাধীদের আড়াল করার যে সিন্ডিকেট তৈরি করেছে, তার অবসান না ঘটালে ৩ লক্ষের এই কলঙ্কিত সংখ্যা আরও বাড়বে।
২০২৬-এর নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বাংলার মানুষ প্রশ্ন তুলছে— আর কত রক্ত ঝরলে নবান্নের ঘুম ভাঙবে? না কি এই নৈরাজ্যই তৃণমূলের আসল ‘উন্নয়ন’?
তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB), FactChecker.in এবং বিভিন্ন জাতীয় সংবাদপত্রের আর্কাইভ।


