উত্তর ২৪ পরগনা: এক সময় বামেদের দুর্গ হিসেবে পরিচিত উত্তর ২৪ পরগনার দমদম উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রটি এবার ২০২৬-এর নির্বাচনে কার্যত রাজ্য রাজনীতির ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ২০১৬ সালে এই আসনটি তৃণমূলের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন সিপিআইএম-এর তন্ময় ভট্টাচার্য। কিন্তু ২০২১-এর ঝড়ে সেই আসন হাতছাড়া হয় বামেদের। এবার আর কোনো ঝুঁকি না নিয়ে সিপিআইএম তাদের অন্যতম লড়াকু এবং জনপ্রিয় যুব মুখ দীপ্সিতা ধর-কে ময়দানে নামিয়ে হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারের ডাক দিয়েছে।
দীপ্সিতা ধর: তারুণ্য ও বিকল্প রাজনীতির নতুন মুখ
বাম শিবিরের রণকৌশল এবার স্পষ্ট—প্রবীণ রাজনীতির বিপরীতে 'তারুণ্যের তেজ'। দীপ্সিতা ধর কেবল একজন প্রার্থী নন, তিনি এসএফআই (SFI) থেকে উঠে আসা এক জেদি কণ্ঠস্বর। তাঁর প্রার্থীপদ ঘোষণার পর থেকেই স্থানীয় বাম কর্মীদের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সিপিআইএম-এর প্রচারে যে বিষয়গুলি প্রাধান্য পাচ্ছে:
আরজি কর কাণ্ডের বিচার: আরজি করের ঘটনার পর থেকে রাজপথে টানা আন্দোলনে থাকা দীপ্সিতা এই কেন্দ্রে 'অভয়া'র বিচার এবং নারী সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে তাঁর প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন।
তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ: নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে পুরসভার কাজে 'কাটমানি'—তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড় প্রমাণ অভিযোগকে হাতিয়ার করে পাড়ায় পাড়ায় ঘরোয়া সভা সারছেন বাম প্রার্থীরা।
শিল্প ও কর্মসংস্থান: চন্দ্রিমার ১,৫০০ টাকার ভাতার পাল্টা হিসেবে বামেরা দিচ্ছে 'স্থায়ী কাজ ও শিল্প'-এর স্লোগান। দমদম-ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের বন্ধ কলকারখানাগুলো পুনরায় চালু করার দাবি বামেদের অন্যতম নির্বাচনী ইশতেহার।
বামপন্থীদের নজরে 'এন্টি-ইনকাম্বেন্সি' ও ভোটব্যাঙ্ক
সিপিআইএম নেতৃত্ব মনে করছে, ২০২১ সালে যে ভোট রামে (BJP) গিয়েছিল, তার একটি বড় অংশ এবার বামেদের ঝোলায় ফিরতে শুরু করেছে।
"মানুষ আজ ক্লান্ত। একদিকে তৃণমূলের বিভেদকামী রাজনীতি আর অন্যদিকে বিজেপির ভাঁওতা—এই দুইয়ের মাঝে দমদম উত্তরের মানুষ এখন বিকল্প খুঁজছেন। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য অভিজ্ঞ হতে পারেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জল-যাতনা বা আরজি করের মতো ঘটনায় তাঁর সরকারের ভূমিকা মানুষ ভোলেনি।" — সিপিআইএম-এর এক জেলা নেতার দাবি।
দমদম উত্তরে বামেদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জসমূহ
যদিও পথটা খুব একটা মসৃণ নয়। বামেদের সামনে প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জ হলো:
১. ভোট বিভাজন: তৃণমূল বিরোধী ভোট যদি বাম ও বিজেপির মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, তবে তার সুবিধা সরাসরি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য পাবেন।
২. পুরসভার মজবুত সংগঠন: উত্তর দমদম ও নিউ বারাকপুর পুরসভায় তৃণমূলের আধিপত্য রয়েছে। বুথ স্তরে সেই সাংগঠনিক শক্তির মোকাবিলা করা দীপ্সিতার জন্য কঠিন পরীক্ষা।
৩. গতবারের ফলাফলের ব্যবধান: ২০২১ সালে সিপিআইএম যেখানে ২১.৪৫% ভোট পেয়েছিল, সেখানে তৃণমূল পেয়েছিল প্রায় ৪৪.৭৯%। এই বড় ব্যবধান মুছে ফেলা বামেদের কাছে পাহাড়প্রমাণ চ্যালেঞ্জ।
কেন দমদম উত্তর এবার বামেদের পাখির চোখ?
২০১৯ এবং ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে এই এলাকায় তৃণমূলের লিড আগের তুলনায় অনেকটা কমেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত এলাকাগুলিতে সরকারি কর্মচারী এবং শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে সরকারের প্রতি ক্ষোভ স্পষ্ট। এই এলাকাগুলিতে দীপ্সিতার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং বক্তৃতার ধরন বামেদের বাড়তি মাইলেজ দিচ্ছে।
২০২৬-এর দমদম উত্তর কেবল একজন বিধায়ক নির্বাচনের লড়াই নয়, এটি বামেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইও বটে। যদি দীপ্সিতা ধর এই কেন্দ্রে উল্লেখযোগ্য ভোট বাড়াতে পারেন বা জয়ী হন, তবে তা গোটা উত্তর ২৪ পরগনায় বামেদের পুনরুত্থানের পথ প্রশস্ত করবে। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের 'উন্নয়ন' বনাম দীপ্সিতার 'ইনসাফ'—দমদম উত্তর এখন সেই মহাযুদ্ধের অপেক্ষায়।


