নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুর: সময়টা যেন থমকে গিয়েছিল ২০১১ সালের পর। দুর্গাপুর— বাংলার ঐতিহ্যবাহী ইস্পাত নগরী, যা একসময় পরিচিত ছিল বামপন্থীদের এক দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে। কারখানার সাইরেন আর লাল ঝান্ডার মিছিল যেখানে সমার্থক ছিল, সেখানে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জমেছিল একরাশ নীরবতা আর দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু আজ, দুর্গাপুর পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের সিটি সেন্টার সংলগ্ন সেল কো-অপারেটিভ (SAIL Co-operative) অঞ্চলে যে দৃশ্য দেখা গেল, তা যেন বহু বছর পর এক ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির জেগে ওঠার শামিল।
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে দুর্গাপুর পশ্চিম কেন্দ্রের বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী প্রভাস সাঁই এর সমর্থনে আজ আয়োজিত হয়েছিল এক 'প্রার্থী পরিচিতি র্যালি'। আর সেই র্যালি যে এমন এক আবেগের বিস্ফোরণ ঘটাবে, তা হয়তো অনেক দুঁদে রাজনৈতিক বিশ্লেষকও আঁচ করতে পারেননি।
এক দশকের খরা কাটাতে রাজপথে জনসমুদ্র
২০১১ সালের রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর দুর্গাপুর পশ্চিম কেন্দ্রে পরপর দুটি নির্বাচনে সিপিআই(এম) তথা বামফ্রন্টকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল। অ-বাম রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দাপটে একসময়ের লাল দুর্গাপুরে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন বাম কর্মী-সমর্থকেরা। লাঞ্ছনা আর বঞ্চনা সহ্য করে যে মানুষগুলো এতকাল নিজেদের গুটিয়ে রেখেছিলেন, আজ তাঁরাই যেন সব বাঁধ ভেঙে রাস্তায় নেমে এলেন।
চোখে জল প্রবীণদের, তারুণ্যের কণ্ঠে অধিকারের লড়াই
দীর্ঘ কয়েক বছর পর দুর্গাপুর পশ্চিমের রাস্তায় আছড়ে পড়ল সেই চেনা লাল সমুদ্র। মিছিল যত এগিয়েছে, ততই তাতে যোগ দিয়েছেন অসংখ্য সাধারণ মানুষ।
প্রবীণদের আবেগ: চুলে পাক ধরা বৃদ্ধ কমরেডদের চোখের কোণে আজ দেখা গেল চিকচিক করা জল— যা হারানো জমি ফিরে পাওয়ার আশার প্রতিফলন।
তারুণ্যের গর্জন: অন্যদিকে, একঝাঁক তরুণ প্রজন্মের মুখে শোনা গেল রুটিরুজির দাবিতে সেই চেনা স্লোগান— "ইনকিলাব জিন্দাবাদ"।
নিছক প্রচার নয়, এ যেন এক মিলনমেলা
প্রার্থী প্রভাস সাঁই যখন জনতার মাঝে হেঁটে চলেছেন, তাঁকে ঘিরে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাস প্রমাণ করছিল, রাজনীতি শুধু অঙ্কের হিসাব নয়, বরং এক গভীর নাড়ির টান। কারখানার শ্রমিক থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ— সকলের উপস্থিতিতে এদিনের র্যালি নিছক রাজনৈতিক প্রচারের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল।
কাস্তে-হাতুড়ি-তারা খচিত পতাকায় ছেয়ে যাওয়া আকাশ আর প্রতিটি পদক্ষেপে যেন একটাই সুর প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল— দুর্গাপুর তার ইতিহাস ভোলেনি। পরপর দুটি পরাজয়ের গ্লানি মুছে ফেলে, বুকভরা জেদ আর অধিকার আদায়ের স্পর্ধা নিয়ে ফের ঘুরে দাঁড়াতে প্রস্তুত বামেরা।
দুর্গাপুরের বাতাসে এখন কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে এক নতুন সমীকরণের সুর। এদিনের এই আবেগঘন জনসমুদ্র কি আসন্ন নির্বাচনে দুর্গাপুর পশ্চিমের ব্যালট বাক্সে নতুন কোনো ইতিহাস লিখবে? সেই উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। তবে আজ, বহু বছর পর লাল আবিরের রঙে রাঙা দুর্গাপুর জানান দিল— ছাইয়ের নিচে আগুন এখনও নিভে যায়নি!













