আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তার অবসান ঘটতে চলেছে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিকোলাস মুল্ডার ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে দাবি করেছেন যে, মার্কিন ডলারের শ্রেষ্ঠত্ব (Hegemony) এখন কেবল নামমাত্র টিকে আছে। ইরান, চীন এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান শক্তি এই আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
অধ্যাপক মুল্ডারের মতে, স্ট্রেট অফ হরমুজে ইরানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, বিশ্ব এখন আর একক কোনো শক্তির অধীনে নেই।
ডলারের অস্ত্র যখন ভোঁতা
দশক পর দশক ধরে ব্র্যাটন উডস চুক্তি এবং নব্য-উদারবাদী অর্থনীতির মাধ্যমে ওয়াশিংটন বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। ফিয়াট কারেন্সির ওপর ভিত্তি করে ডলার ছাপিয়ে তারা সারা বিশ্বে ৮০০-এর বেশি সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করেছে। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র দ্রুত পাল্টাচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে:
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এখন অকার্যকর: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞাগুলো এখন আর আগের মতো কাজ করছে না। গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণের দেশগুলো বিকল্প বাণিজ্য পথ খুঁজে নিচ্ছে।
বিকল্প জোটের উত্থান: ব্রিকস (BRICS) এবং চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI) ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিশ্বের দেশগুলোকে এক নতুন অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম দিচ্ছে।
পাল্টা ব্যবস্থা: চীন তাদের বিরল খনিজ (Rare Earth minerals) রপ্তানি এবং রাশিয়া তাদের 'পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২' প্রকল্পের মাধ্যমে পশ্চিমা চাপের পাল্টা জবাব দিচ্ছে।
সংঘাত এবং বিশ্ব সংকট
স্ট্রেট অফ হরমুজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম এবং জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া ওয়াশিংটনকে বাধ্য করেছে রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে কিছুটা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে। অধ্যাপক মুল্ডারের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এখন আর যুদ্ধের বিকল্প নয়, বরং এটি বিশ্ববাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ভেনেজুয়েলা, ইরান এবং রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো এই প্যাটার্নকেই স্পষ্ট করে তোলে। ইউক্রেন সংকট এবং চীনের সাথে ট্রাম্প আমলের বাণিজ্য যুদ্ধও মার্কিন প্রভাব হ্রাসের গতি ত্বরান্বিত করেছে।
অভ্যন্তরীণ সংকট ও সাম্রাজ্যের পতন
প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয় যে, ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকেই মার্কিন সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়েছে। একাধিপত্য ধরে রাখতে ওয়াশিংটন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যখন দেশের ভেতরে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়েছে এবং সাধারণ আমেরিকানরা ঋণের চাপে পিষ্ট হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক একাধিকার এখন ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানোর অপেক্ষায়। বিশ্ব এখন একটি বহুমুখী (Multipolar) ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে একক কোনো মুদ্রার খবরদারি আর চলবে না।


