নিজস্ব প্রতিনিধি, উত্তরপাড়া: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের যে কয়েকটি আসন সারা রাজ্যের নজর কেড়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হুগলির উত্তরপাড়া। এই কেন্দ্রটি এখন কেবল একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়, বরং রাজ্যের বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণের এক পরীক্ষাগার। লড়াইটা একদিকে বামফ্রন্টের যুবনেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় এবং অন্যদিকে তৃণমূলের হেভিওয়েট সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র শীর্ষাণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মধ্যে।
বিগত ১০ বছরের (২০১৬-২০২১) ভোটের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উত্তরপাড়ায় তৃণমূলের আধিপত্য থাকলেও পর্দার আড়ালে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ‘বামেদের প্রত্যাবর্তনের’ সুপ্ত ইঙ্গিত রয়েছে।
📊 পরিসংখ্যানের আয়নায় উত্তরপাড়া: ২০১৬ বনাম ২০২১
উত্তরপাড়ার নির্বাচনী ইতিহাস গত এক দশকে অত্যন্ত নাটকীয় মোড় নিয়েছে।
| সাল | তৃণমূল (AITC) | বামফ্রন্ট (CPI-M) | বিজেপি (BJP) | জয়ের ব্যবধান |
| ২০১৬ | ৪৪.৮৯% (জয়ী) | ৩৮.৫৫% | ১২.৫২% | ১২,০০০ ভোট |
| ২০২১ | ৪৬.৯৬% (জয়ী) | ২১.৩৭% | ২৮.৯৬% | ৩৫,৯৮৯ ভোট |
প্যাটার্ন বিশ্লেষণ:
১. বামেদের ভোট বিজেপিতে স্থানান্তর: ২০২১ সালে বামেদের ভোট প্রায় ১৭% কমে গিয়েছিল, যার সরাসরি প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল বিজেপির ভোটবৃদ্ধিতে (১২% থেকে ২৯%)।
২. বিরোধী ভোট বিভাজন: গত নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের প্রধান কারণ ছিল বিরোধী ভোট বাম ও বিজেপির মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়া।
🔥 মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের অনুকূলে ‘ইন্টারেস্টিং’ রাজনৈতিক প্যাটার্ন
২০২৬-এর লড়াইয়ে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের জন্য পরিসংখ্যানের বাইরেও কিছু বিশেষ ‘অ্যাঙ্গেল’ কাজ করছে, যা বামেদের জেতার স্বপ্নে অক্সিজেন জোগাচ্ছে:
১. ‘ঘরওয়াপসি’ বা বাম ভোটের পুনর্মিলন
২০২১-এ উত্তরপাড়ার যে ১৭% বাম সমর্থক ‘তৃণমূলকে হারাতে’ বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন, ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের ট্রেন্ড অনুযায়ী সেই ভোটারদের একটি বড় অংশ হতাশ হয়ে আবার কাস্তে-হাতুড়ি চিহ্নে ফিরতে শুরু করেছেন। মীনাক্ষীর ব্যক্তিগত স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এই ‘বাম-টু-রাম’ ভোটারদের ফেরাতে চুম্বকের মতো কাজ করছে।
২. আরজি কর পরবর্তী ‘নাগরিক চেতনা’
উত্তরপাড়া একটি শিক্ষিত, মার্জিত এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত প্রধান এলাকা। সাম্প্রতিক ‘তিলোত্তমা’ ইস্যু বা আরজি কর কাণ্ডের পর থেকে এই এলাকায় নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে শাসকদলের প্রতি এক ধরনের বিমুখতা তৈরি হয়েছে। মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হওয়ায়, নির্দল বা ‘ফ্লোটিং’ ভোটারদের বড় অংশ তার দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।
৩. শিল্প বনাম দুর্নীতি: ন্যারেটিভের লড়াই
শীর্ষাণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তৃণমূলের উন্নয়ন ও ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-কে হাতিয়ার করছেন, মীনাক্ষী তখন লড়াই নিয়ে যাচ্ছেন বন্ধ কলকারখানা (হিন্দমোটর) এবং শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের ইস্যুতে। উত্তরপাড়ার শ্রমিক কলোনিগুলোতে মীনাক্ষীর জনপ্রিয়তা শীর্ষাণ্যর ‘অভিজাত রাজনৈতিক পরিচয়’-এর বিপরীতে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
⚔️ লড়াইয়ের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
তৃণমূলের লক্ষ্য: শীর্ষাণ্যর সামনে চ্যালেঞ্জ হলো বাবার (কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়) ব্যক্তিগত ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখা এবং প্রায় ৪৬% ক্যাশ ভোটকে অক্ষুণ্ণ রাখা।
বামেদের লক্ষ্য: মীনাক্ষীকে জিততে হলে ২০২১-এর ২১% ভোটকে অন্তত ৩৮%-এ নিয়ে যেতে হবে। এর অর্থ হলো বিজেপির ঝুলিতে থাকা বিরোধী ভোটের অন্তত ১৫% নিজের দিকে টেনে আনা।
বিজেপি ফ্যাক্টর: বিজেপি যদি তাদের ২৯% ভোট ধরে রাখতে না পারে এবং সেই ভোট যদি একতরফাভাবে বামেদের দিকে যায়, তবে উত্তরপাড়ার ফলাফল তৃণমূলের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
কে শেষ হাসি হাসবেন?
পরিসংখ্যান বলছে, উত্তরপাড়ায় তৃণমূলের লিড ৩৬,০০০-এর কাছাকাছি। কিন্তু রাজনীতির রসায়ন বলছে, মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের লড়াকু মেজাজ এবং সাম্প্রতিক নাগরিক আন্দোলনের ঢেউ যদি ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়, তবে এই ৩৬ হাজার ভোটের ব্যবধান মেটানো অসম্ভব নয়। অন্যদিকে, শীর্ষাণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় যদি তারুণ্যের মোড়কে সরকারি প্রকল্পের সুফল ঘরে তুলতে পারেন, তবে উত্তরপাড়া তৃণমূলের দুর্গ হিসেবেই থেকে যাবে।
একদিকে ‘সাংসদ পুত্রের’ উত্তরাধিকার রক্ষার লড়াই, অন্যদিকে ‘সাধারণ ঘরের মেয়ের’ বিকল্প রাজনীতি— ২০২৬-এ উত্তরপাড়া সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গকে এক নতুন রাজনৈতিক দিশা দেখাবে।

.jpg)
.jpg)
