নিজস্ব প্রতিবেদন, দুর্গাপুর: "সাবাস, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়"— মাত্র ২১ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে বাংলা সাহিত্যকে যে অগ্নিগর্ভ স্পর্ধা উপহার দিয়ে গেছেন কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, আজ তাঁর জন্মশতবর্ষে (১৯২৬-২০২৬) দাঁড়িয়ে সেই লেখনীর ধার যেন আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। সুকান্ত মানেই বিদ্রোহ, সুকান্ত মানেই শোষিতের জয়গান। কিন্তু প্রথাগত বামপন্থী আন্দোলনের ঊর্ধ্বে উঠে সুকান্তর কাব্যে 'নারী ভাবনার প্রাসঙ্গিকতা' এবং লৈঙ্গিক সাম্যের যে চোরা স্রোত ছিল, তা বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে নতুন করে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
ব্যাকরণের শিকল বনাম আত্মপরিচয়
সুকান্ত ভট্টাচার্যের হাস্যরস ও ব্যঙ্গাত্মক কবিতার সংকলন 'মিঠে-কড়া'-তে তাঁর আধুনিক মনস্কতার পরিচয় পাওয়া যায়। বিশেষ করে 'মেয়েদের পদবী' কবিতায় তিনি ভাষার ব্যাকরণকে ঢাল করে নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
"গুপ্ত' 'গুপ্তা' হয় মেয়েদের নামে...
সে নিয়মে যদি আজ 'ঘোষ' হয় 'ঘোষা',
তা হলে অনেক মেয়ে করবেই গোসা।"
তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে দাঁড়িয়ে নামের শেষে 'আ'কার যুক্ত করে নারীকে পুরুষের ছায়া বা 'স্ত্রীলিঙ্গ' হিসেবে চিহ্নিত করার যে প্রবণতা ছিল, সুকান্ত তাকে সপাটে আঘাত করেছিলেন। আজকের দিনে যখন বিশ্বজুড়ে নারীরা নিজেদের পৈতৃক বা স্বামীর পরিচয়ের বাইরে নিজস্ব 'আইডেন্টিটি' বা নাম ধরে ডাকার লড়াই করছেন, তখন সুকান্তর এই শতবর্ষ প্রাচীন চিন্তাটি অভাবনীয়ভাবে আধুনিক মনে হয়।
শ্রমজীবী নারীর সহযোদ্ধা ও শ্রেণিহীন সমাজ
একজন একনিষ্ঠ কমিউনিস্ট কর্মী হিসেবে সুকান্ত সমাজকে চিনেছিলেন মাঠ-ঘাট আর কলকারখানার লড়াইয়ের ময়দানে। তাঁর কবিতায় নারী কেবল অন্দরের অলঙ্কার নয়, বরং ইতিহাসের চাকা ঘোরানোর অন্যতম কারিগর। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ (পঞ্চাশের মন্বন্তর) থেকে শুরু করে দেশভাগ ও দাঙ্গার সেই উত্তাল সময়ে নারী যে কেবল 'আর্ত' বা 'শোষিত' ছিল না, বরং বেঁচে থাকার লড়াইয়ে পুরুষের সমান অংশীদার ছিল, সুকান্ত তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।
তাঁর কাব্যে নারী কোনো রোমান্টিক কল্পনার মানসী নয়, বরং সে মিছিলে হাঁটা কমরেড কিংবা ক্ষুধার্ত সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য লড়াই করা মা। আজকের পৃথিবীতে যখন কর্মক্ষেত্রে সম-মজুরি এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে বিতর্ক চলছে, তখন সুকান্তর 'সাম্যবাদী' নারী চেতনা আমাদের এক নতুন দিশা দেখায়।
'ছাড়পত্র' ও আগামী প্রজন্মের নারী
সুকান্ত তাঁর কালজয়ী 'ছাড়পত্র' কবিতায় যে নবজাতকের জন্য বিশ্বকে বাসযোগ্য করার অঙ্গীকার করেছিলেন, সেই প্রতিশ্রুতির মধ্যে কোনো লিঙ্গবৈষম্য ছিল না। তাঁর কাছে অনাগত শিশু মানেই ছিল আগামীর পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে কন্যাসন্তানের নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করাই ছিল কবির কলমের মূল লক্ষ্য। বর্তমান ভারতে যখন নারী নিরাপত্তা একটি জ্বলন্ত ইস্যু, তখন সুকান্তর সেই ঘোষণা— "এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক'রে যাব আমি"— আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই দায়বদ্ধতা কেবল কবির নয়, গোটা সমাজের।
কবির জন্মশতবর্ষে আমাদের করণীয়
দুর্গাপুর সহ বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে আজ সুকান্তর জন্মশতবর্ষ পালিত হচ্ছে। কিন্তু এই উদযাপন কেবল সভার বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সুকান্তর কবিতা থেকে আমাদের শিখতে হবে:
১. নারীর নিজস্ব সত্তার স্বীকৃতি: তাকে কোনো কৃত্রিম আবরণে না ঢেকে মানুষের মর্যাদা দেওয়া।
২. সংগ্রামী চেতনা: কুসংস্কার ও পিতৃতান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে নারীদের সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করা।
৩. শিক্ষা ও সমঅধিকার: সুকান্তর স্বপ্ন ছিল এমন এক সমাজ যেখানে ক্ষুধার জ্বালা থাকবে না, এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে সমান সুযোগ পাবে।
সুকান্ত ভট্টাচার্য কেবল 'কিশোর কবি' নন, তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে অগ্রবর্তী এক দ্রষ্টা। তাঁর জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে আমাদের অনুধাবন করতে হবে যে, তাঁর সাম্যবাদের মূল ভিত্তিই ছিল মানবতাবাদ— যেখানে নারী ও পুরুষের বিভাজন নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে লড়াইয়ের কথা বলা হয়েছে। কবি সুকান্ত আজও আমাদের মিছিলে আছেন, আছেন আমাদের চিন্তার শাণিত অস্ত্রে।


