বিশেষ প্রতিবেদন
ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে দুটি ছবি সমান্তরালে ভাসছে। একদিকে নব্বইয়ের দশকের সেই ঋজু দেহভঙ্গি, যাঁর একটি হুঙ্কারে দিল্লির মসনদ কেঁপে উঠত—তিনি টি এন সেশন। আর অন্যদিকে আজকের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে থাকা একদল আমলা, যাঁদের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে বলা হচ্ছে তাঁরা শাসকের ‘বুট পলিশ’ করতে ব্যস্ত। এই রূপান্তর কেবল সময়ের বিবর্তন নয়, এটি একটি আদর্শিক পতন।
সেশন: যখন শিরদাঁড়া ছিল সোজা
টি এন সেশন যখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার হয়েছিলেন, তখন বুথ দখল ছিল রাজনীতির অলিখিত নিয়ম। তিনি শিখিয়েছিলেন, ভোটার লিস্ট মানে কেবল নাম নয়, তা হলো নাগরিকের অধিকার। সেশন কোনো দলের হয়ে কথা বলেননি, তিনি কথা বলেছিলেন সংবিধানের হয়ে। সেই সময় শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি নির্বাচন স্থগিত করে দেওয়ার সাহস দেখাতেন। তাঁর আমলে বুথ রাজনীতি ছিল স্বচ্ছতার লড়াই, যেখানে গুন্ডাদের স্থান ছিল জেলখানায়।
বর্তমানের ‘বুট পলিটিক্স’: আস্থার অপমৃত্যু
আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যখন আমরা নির্বাচন কমিশনের দিকে তাকাই, তখন দেখা যায় এক অদ্ভুত সমর্পণ। অভিযোগ উঠছে, আজকের কমিশনাররা সংবিধানের রক্ষক নন, বরং শাসক দলের ‘এক্সটেনশন কাউন্টার’ হিসেবে কাজ করছেন।
ভোটার তালিকায় ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’: সাম্প্রতিক 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (SIR)-এর নামে যা হয়েছে, তাকে বিরোধীরা বলছেন ‘গণতান্ত্রিক নিধনযজ্ঞ’। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মতো রাজ্যগুলিতে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের নাম যেভাবে তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে, তা এক গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়। যখন একজন আজীবন ভোটার বুথে গিয়ে দেখেন তাঁর নাম নেই, তখন সেই কান্না কোনো প্রযুক্তির ব্যাখ্যা দিয়ে মোছা যায় না।
আচরণবিধির প্রহসন: প্রধানমন্ত্রী যখন প্রকাশ্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিভাজনের রাজনীতি করেন, তখন কমিশনের কান বন্ধ থাকে। কিন্তু একজন সাধারণ বিরোধী কর্মী টুঁ শব্দটি করলেই তাঁর টুঁটি চেপে ধরা হয়। এই যে দ্বিমুখী নীতি, একেই রাজনীতির ভাষায় বলা হচ্ছে ‘বুট লিকিং পলিটিক্স’। ক্ষমতার পা চেটে নিজেদের পদ টিকিয়ে রাখার এই প্রবণতা আজ ভারতীয় গণতন্ত্রকে আইসিইউ-তে পাঠিয়ে দিয়েছে।
প্রযুক্তির আড়ালে অন্ধকার
একসময় ব্যালট লুঠ হতো পেশিশক্তিতে, আজ অভিযোগ উঠছে ভোট চুরি হচ্ছে প্রযুক্তির কারসাজিতে। ভিভিপ্যাট (VVPAT) সলিপ গণনা নিয়ে কমিশনের অনীহা যেন সেই সন্দেহের আগুনে ঘি ঢালছে। তথ্য গোপনের যে খেলা এখন চলছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে—"আমার ভোটটা কি সঠিক জায়গায় পৌঁছাল?" এই অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হওয়াই তো গণতন্ত্রের সবথেকে বড় পরাজয়।
এখন প্রশ্ন তোলার সময়
টি এন সেশন শিখিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশন হবে নির্ভীক। কিন্তু আজ সেই চেয়ারে বসে যারা শাসকের তুষ্টিতে ব্যস্ত, তারা ভুলে যাচ্ছেন যে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। আজ যারা গণতন্ত্রের মন্দিরকে ক্ষমতার অপব্যবহারের আখড়া বানিয়েছেন, কালকের প্রজন্ম তাঁদের মনে রাখবে কেবল ‘আজ্ঞাবহ ভৃত্য’ হিসেবে।
আজকের লড়াইটা কেবল ইভিএম বা বুথের নয়, লড়াইটা হলো আমাদের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার। গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড আবার সোজা করতে হলে সেই সেশনের আমলের আপসহীন মানসিকতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। নচেৎ, বুথ রাজনীতি কেবল শোষণের হাতিয়ার হয়েই থেকে যাবে।


