বামফ্রন্ট আমল (১৯৭৭-২০১১): শিল্পায়নের উত্তরণ, রূপান্তর এবং সংগ্রামের এক দীর্ঘ দলিল
বিশেষ প্রতিবেদক, দুর্গাপুর | ৩০ মার্চ, ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনকাল এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭৭ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে যখন বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন রাজ্যের শিল্প পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। দেশভাগের ক্ষত, পাটের বাজারের ধস এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় ধুঁকতে থাকা বাংলাকে শিল্পে পুনরুজ্জীবিত করার দায়িত্ব নেয় এই সরকার। নিচে তথ্য ও উপাত্তসহ এই দীর্ঘ সময়কালের শিল্প-বিবর্তন আলোচনা করা হলো।
১. প্রথম দফার শিল্পায়ন: ১৯৭৮-এর নীতি ও ক্ষুদ্র শিল্পের জয়গান
ক্ষমতায় আসার ঠিক পরেই, ১৯৭৮ সালে বামফ্রন্ট তাদের প্রথম শিল্প নীতি ঘোষণা করে। এই নীতির মূল লক্ষ্য ছিল বড় পুঁজিপতিদের আধিপত্য কমানো এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে (MSME) শক্তিশালী করা।
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
MSME-তে বিপ্লব: বড় কারখানার চেয়ে ছোট ছোট শিল্প ইউনিট গঠনে জোর দেওয়া হয়। এর ফলে জেলায় জেলায় ছোট কারখানা ও সমবায় গড়ে ওঠে।
কর্মসংস্থান: ২০০১-০২ সালের শিল্প শুমারি অনুযায়ী, ক্ষুদ্র শিল্পে কর্মসংস্থানের দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্যান্য উন্নত রাজ্যকে পেছনে ফেলে শীর্ষে পৌঁছেছিল।
সাফল্য: ২০০০-০১ সাল পর্যন্ত রাজ্যে প্রায় ২৭.৭ লক্ষ ক্ষুদ্র শিল্প ইউনিট কার্যকর ছিল, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিরাট পরিবর্তন আনে।
২. শিল্পায়নের পথে বড় বাধা: কেন্দ্রীয় নীতি ও বঞ্চনা
বামফ্রন্ট সরকারের পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু নীতি পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের পথ রুদ্ধ করেছে।
মালভাড়া সমীকরণ নীতি (Freight Equalisation Policy): এই নীতির ফলে পশ্চিমবঙ্গ তার কয়লা ও লোহার প্রাকৃতিক সুবিধা হারায়।
সারা দেশে খনিজ সম্পদের দাম সমান করে দেওয়ায় শিল্পপতিরা অন্য রাজ্যে চলে যেতে শুরু করেন। লাইসেন্স রাজ: বড় প্রকল্পের জন্য লাইসেন্স পেতে বাম শাসিত সরকারকে দিল্লির মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হতো। হলদিয়া পেট্রোকেমিকেলস বা বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বড় প্রকল্পের অনুমোদন পেতে দশকের পর দশক সময় লেগেছিল।
৩. ১৯৯৪-এর বাঁকবদল: জ্যোতি বসুর নতুন দিশা
ভারতের অর্থনীতিতে ১৯৯১ সালের উদারীকরণের প্রভাব পড়ে এই রাজ্যেও। ১৯৯৪ সালে জ্যোতি বসু এক প্রগতিশীল শিল্প নীতি ঘোষণা করেন, যা বামপন্থীদের চিরাচরিত অবস্থানের এক বিরাট রূপান্তর।
বেসরকারি পুঁজিকে স্বাগত: প্রথমবারের মতো টাটা, আম্বানি বা বিদেশের বড় পুঁজিকে রাজ্যে আসার আহ্বান জানানো হয়।
আইটি ও পেট্রোকেমিকেলস: সল্টলেক সেক্টর ফাইভ-কে আইটি হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং হলদিয়া পেট্রোকেমিকেলসকে বাস্তবে রূপ দেওয়া ছিল এই সময়ের বড় অর্জন।
৪. বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমল: 'শিল্পই ভবিষ্যৎ' (২০০০-২০১১)
২০০০ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর স্লোগান দেন— "কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ"। তাঁর আমলে রাজ্য এক আগ্রাসী শিল্পায়নের পথে হাঁটে।
তথ্য ও উপাত্ত (Data Insight):
| বিষয় (২০১০-১১ অনুযায়ী) | বাম জমানার খতিয়ান |
| নতুন শিল্প ইউনিট | ২০০৬-১০ এর মধ্যে ১,৩১৩টি মাঝারি ও বড় শিল্প ইউনিট স্থাপিত হয়। |
| মোট বিনিয়োগ | এই ৫ বছরে বাস্তবায়িত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৬,২৭০ কোটি টাকা। |
| শিল্প প্রবৃদ্ধির হার | ২০০৪-০৫ সালে রাজ্যের শিল্প প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১২.২%, যা তৎকালীন জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। |
| উৎপাদন খরচ | গুজরাটের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে পণ্য উৎপাদন খরচ অনেক কম ছিল (প্রতি ১০০০ টাকায় ৭৯৪ টাকা)। |
৫. সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম: একটি স্বপ্নের অবসান
শিল্পায়নের এই জয়যাত্রা হোঁচট খায় জমি অধিগ্রহণ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। টাটা গোষ্ঠীর 'ন্যানো' গাড়ি কারখানা সিঙ্গুর থেকে চলে যাওয়া এবং নন্দীগ্রামের 'সেজ' (SEZ) বিরোধী আন্দোলন বামফ্রন্ট সরকারের ভিত নড়িয়ে দেয়। জমি-কেন্দ্রিক এই সংঘাতই শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করে।
বাম জমানার শিল্পায়নের মূল উত্তরাধিকার (Legacy)
বামফ্রন্ট আমলের ৩৪ বছরের দীর্ঘ পথচলায় যেমন চড়াই-উতরাই ছিল, তেমনই কিছু স্থায়ী অর্জনও ছিল যা বর্তমান বাংলার শিল্পের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে:
হলদিয়া ও দুর্গাপুর: এই দুই শিল্পাঞ্চলকে আধুনিক রূপ প্রদান।
রাজারহাট-নিউটাউন ও সেক্টর ফাইভ: বাংলার তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের ভিত্তিপ্রস্তর।
ক্ষুদ্র শিল্প (MSME): রাজ্যে ক্ষুদ্র শিল্পের এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি, যা আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের অন্নসংস্থান করছে।
উপসংহার: বামফ্রন্টের শিল্পায়ন ছিল কৃষি বিপ্লবের পরবর্তী এক স্বাভাবিক পর্যায়। মতাদর্শগত অবস্থান থেকে শুরু করে বাজার অর্থনীতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এই ৩৪ বছরের ইতিহাস আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সূত্র: পশ্চিমবঙ্গ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, সিএসও (CSO) এবং সিএসএস (CESS) রিপোর্ট।


