নিজস্ব প্রতিনিধি, শিলিগুড়ি ও কলকাতা: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার ঠিক আগেই উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে ফিরে এল পুরনো সেই বিতর্ক— 'গোর্খাল্যান্ড'। দার্জিলিং, কালিম্পং, শিলিগুড়ি এবং ডুয়ার্সের একাংশ নিয়ে পৃথক রাজ্যের দাবিতে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা ও জিএনএলএফ-এর মতো দলগুলি যখন ফের সরব, তখন কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের অবস্থান নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে।
দিল্লির বৈঠক ও অমীমাংসিত সমাধান
২০২৫ সালের এপ্রিলে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের উদ্যোগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাইয়ের উপস্থিতিতে সেই বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন বিমল গুরুং, নীরজ জিম্বাদের মতো পাহাড়ের হেভিওয়েট নেতারা। সূত্রের খবর, বৈঠকে পৃথক রাজ্য বা লাদাখের মতো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (Union Territory) করার প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে ভোটের আগে গোর্খা নেতাদের সাথে বিজেপির এই ঘনিষ্ঠতা তৃণমূল শিবিরের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
বিজেপির কৌশল ও 'স্থায়ী সমাধান'
বিজেপি বরাবরই পাহাড়ের ভোটারদের কাছে 'স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান'-এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। যদিও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সরাসরি 'গোর্খাল্যান্ড' শব্দটি উচ্চারণে সতর্ক, তবুও নীরজ জিম্বার মতো বিজেপি বিধায়করা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, পাহাড়ের মানুষের আবেগকে মর্যাদা দিতে সংবিধানের গণ্ডির মধ্যেই সমাধান খোঁজা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরবঙ্গের আসনগুলি কবজায় রাখতে বিজেপি এবার 'ইউনিয়ন টেরিটরি' বা 'স্পেশাল স্ট্যাটাস'-এর কার্ড খেলতে পারে।
তৃণমূলের পাল্টা চাল: 'অবিভক্ত বাংলা'
বিজেপির এই পদক্ষেপের পাল্টা হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেস 'অবিভক্ত বাংলা'র স্বপ্নে শান দিচ্ছেন। উত্তরবঙ্গ সফরের মাঝেই তৃণমূল নেতৃত্ব বারবার হুঙ্কার দিচ্ছেন, "বাংলা ভাগ হতে দেব না।" তৃণমূলের দাবি, বিজেপি ভোটের আগে পাহাড়ের মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। সাম্প্রতিককালে পাহাড়ের রাজনীতিতে অনীত থাপার মতো নেতাদের গুরুত্ব বাড়িয়ে এবং উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে গোর্খাল্যান্ডের আবেগকে স্তিমিত করার চেষ্টা করছে ঘাসফুল শিবির।
পাহাড়ের সমীকরণ: এক নজরে
আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু: দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং ও ডুয়ার্স।
প্রধান চরিত্র: বিমল গুরুং (GJM), নীরজ জিম্বা (BJP/GNLF), রাজু বিস্ট (দার্জিলিং সাংসদ)।
বিতর্কের বিষয়: কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (UT) বনাম গোর্খাল্যান্ড রাজ্য।
বর্তমান পরিস্থিতি: ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হলেও রাজ্য সরকারের অনুপস্থিতিতে কোনো চূড়ান্ত আইনি রূপরেখা তৈরি হয়নি।
নির্বাচনের আগে গোর্খাল্যান্ডের এই ধিকিধিকি আগুন শেষ পর্যন্ত ভোটবাক্সে কার পাল্লা ভারী করে, এখন সেটাই দেখার। পাহাড়ের কুয়াশা কি কাটবে, নাকি রাজনীতির চোরাস্রোতে ফের উত্তপ্ত হবে শৈলশহর? উত্তর দেবে সময়।


