বিশেষ প্রতিবেদন | কলকাতা
ভারতের চিকিৎসা ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি, প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মণিকুমার ছেত্রী (Dr. Mani Kumar Chetri) ১০৫ বছর বয়সে পরলোকগমন করেছেন। ৫ এপ্রিল ২০২৬, রবিবার কলকাতার নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁর জীবনাবসান হয়। তাঁর মৃত্যুতে ভারতের চিকিৎসা অঙ্গনে একটি স্বর্ণযুগের অবসান ঘটল। ১৯২০ সাল থেকে ২০২৬—এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের এই দীর্ঘ জীবনে তিনি কেবল লক্ষ লক্ষ রোগীকে সুস্থ করেননি, বরং পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
শৈশব ও মেধার উন্মেষ
১৯২০ সালের ২৩ মে ব্রিটিশ ভারতের দার্জিলিঙের কোঠি ভ্যালি এলাকায় এক নেপালি পরিবারে ডা. ছেত্রীর জন্ম। পাহাড়ের প্রতিকূল পরিবেশে বড় হলেও মেধার স্বাক্ষর রেখেছিলেন শৈশব থেকেই। দার্জিলিং সরকারি হাই স্কুল থেকে ১৯৩৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান। সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল মিশন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন তৎকালীন এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। ১৯৪৪ সালে সেখান থেকে এমবিবিএস এবং ১৯৪৯ সালে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন।
আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও উচ্চশিক্ষা
তৎকালীন ভারত সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে তিনি লন্ডনে উচ্চশিক্ষার জন্য যান। ১৯৫৫ সালে তিনি MRCP এবং ১৯৫৬ সালে FRCP ডিগ্রি অর্জন করেন। লন্ডন থেকে ফিরে এসে তিনি কলকাতার স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে তিনি কলকাতার আইপিজিএমইআর (IPGMER) ও এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালে হৃদরোগ বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান হিসেবে যোগদান করেন।
পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অবদান
ডা. মণিকুমার ছেত্রীর অবদান কেবল প্রেসক্রিপশনের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক।
SSKM-এর আধুনিকীকরণ: তাঁর নেতৃত্বেই এসএসকেএম হাসপাতাল পূর্ব ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হৃদরোগ নিরাময় কেন্দ্রে পরিণত হয়।
উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ: উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ পৌঁছে দিতে ১৯৬০-এর দশকে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল (NBMCH) স্থাপনে তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন।
প্রশাসনিক দায়িত্ব: ১৯৭৬ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য অধিকর্তা (Director of Health Services) নিযুক্ত হন। ১৯৯৭ সালে তিনি আমরি (AMRI) হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
জ্যোতি বসুর ছায়াসঙ্গী
পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘতম মেয়াদের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর তিনি ছিলেন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসক। জ্যোতি বসুর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ডা. ছেত্রী তাঁর স্বাস্থ্যের তদারকি করেছেন। রাজনৈতিক মহলে তাঁর নিরপেক্ষতা এবং পেশাদারিত্ব ছিল উদাহরণ দেওয়ার মতো।
পুরস্কার ও জীবনদর্শন
১৯৭৪ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে 'পদ্মশ্রী' উপাধিতে ভূষিত করে। এছাড়াও তিনি অসংখ্য স্বর্ণপদক এবং দেশ-বিদেশের নানা সম্মাননা পেয়েছেন।
১০০ বছর বয়স পার করার পরেও তিনি মানসিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন "Minimum Medicine, Maximum Results" (ন্যূনতম ওষুধে সর্বোচ্চ ফল) তত্ত্বে। নবীন চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে তাঁর চিরকালীন বার্তা ছিল— "কেবল অর্থ উপার্জন নয়, গবেষণায় মন দাও; গবেষণা না থাকলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা থমকে যাবে।" তাঁর এই আহ্বানকে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ও সমর্থন জানিয়েছিলেন।
পাহাড়ের সন্তান হয়েও ডা. মণিকুমার ছেত্রী কলকাতাকে তাঁর কর্মভূমি বানিয়েছিলেন এবং তিল তিল করে বাংলার স্বাস্থ্য পরিষেবাকে গড়ে তুলেছিলেন। ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের পরবর্তী সময়ে বাংলার চিকিৎসা জগতে তাঁর মতো ব্যক্তিত্ব বিরল। তাঁর মৃত্যুতে হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর—সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে চিরকাল বেঁচে থাকবেন কয়েক প্রজন্মের চিকিৎসকদের অনুপ্রেরণা হয়ে।


