‘রাশিয়ার চিঠি’ (১৯৩১) কেবল একটি ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়, এটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমাজ-দর্শন, রাজনৈতিক ভাবনা এবং শোষিত মানুষের মুক্তির স্বপ্নের এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল। ১৯৩০ সালে (১৩৩৮ বঙ্গাব্দে) সোভিয়েত রাশিয়া পরিভ্রমণ শেষে তিনি তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও গভীর মননশীলতার মিশেলে এই পত্র-প্রবন্ধ সংকলনটি রচনা করেন। বিশ্বভারতী গ্রন্থালয় থেকে প্রকাশিত চোদ্দটি চিঠি ও চারটি প্রবন্ধের এই গ্রন্থে একদিকে যেমন উঠে এসেছে নতুন এক সমাজব্যবস্থার প্রতি কবির অকুণ্ঠ প্রশংসা, তেমনি ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে উচ্চারিত হয়েছে তাঁর তীক্ষ্ণ সমালোচনা।
রাশিয়া ভ্রমণের ঐতিহাসিক পটভূমি ও বাধা
সোভিয়েত রাশিয়ার নতুন সমাজব্যবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্য রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘকাল ধরে কৌতূহলী ছিলেন। এই ঐতিহাসিক সফরের প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:
দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও বারবার আমন্ত্রণ: ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের পর নতুন সমাজ গড়ার যে বিপুল কর্মযজ্ঞ রাশিয়ায় শুরু হয়েছিল, তা বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিল। ১৯২৫ থেকে ১৯২৮ সালের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ মোট পাঁচবার সোভিয়েত সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমন্ত্রণ পান। বহু প্রতীক্ষার পর অবশেষে ১৯৩০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মস্কোয় পা রাখেন।
সাম্রাজ্যবাদী শক্তির রক্তচক্ষু ও বন্ধুদের বাধা: রবীন্দ্রনাথের এই রাশিয়া যাত্রায় প্রবল বাধা এসেছিল তাঁর ইংরেজ বন্ধুদের কাছ থেকে। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতে সোভিয়েত রাশিয়া সম্পর্কে কেবল নেতিবাচক ও বিদ্বেষপূর্ণ খবরই প্রচার করা হতো। ইংরেজরা ভয় পেয়েছিল যে, রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্ববরেণ্য বুদ্ধিজীবী যদি রাশিয়ার সমাজব্যবস্থা নিয়ে ইতিবাচক কিছু বলেন, তবে তা আন্তর্জাতিক স্তরে ও ভারতের বুদ্ধিজীবী মহলে বিশাল প্রভাব ফেলবে।
পুঁজিবাদের অমানবিক রূপ দর্শন: পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে রবীন্দ্রনাথ আগেই দেখেছিলেন, কীভাবে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা নিছক মুনাফা ও অর্থের লোভে মানুষের মনুষ্যত্বকে গ্রাস করছে। তাই বিকল্প এক অ-শোষণমূলক ব্যবস্থার সন্ধানে বলশেভিকদের এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা তাঁকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছিল।
মস্কোর দিনলিপি ও 'তীর্থদর্শন'-এর অনুভূতি
মাত্র পনেরো দিনের (১১-২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৩০) এক অত্যন্ত ব্যস্ত ও ঠাসা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ রুশ সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি কৃষক, শ্রমিক, শিল্পী, লেখক, ছাত্র এবং সংস্কৃতি কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। মস্কোতে তাঁর আঁকা ছবির প্রদর্শনী হয়, তিনি মস্কো আর্ট থিয়েটারে নাটক এবং বিখ্যাত বলশয় থিয়েটারে ব্যালেও উপভোগ করেন।
এই সফর তাঁর মননে এত গভীর রেখাপাত করেছিল যে, তিনি একে জীবনের এক "তীর্থযাত্রা" বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এই দেশে না এলে তাঁর জীবনের তীর্থদর্শন অসম্পূর্ণ থেকে যেত। মস্কো থেকে লেখা তাঁর প্রথম চিঠিতেই সেই বিস্ময় ঝরে পড়েছিল:
"রাশিয়ায় অবশেষে আসা গেল। যা দেখছি আশ্চর্য ঠেকছে। অন্য কোনো দেশের মতোই নয়। একেবারে মূলে প্রভেদ। আগাগোড়া সকল মানুষকেই এরা সমান করে জাগিয়ে তুলছে।"
মেহনতি মানুষের জাগরণ ও ধনবৈষম্যের অবসান
রবীন্দ্রনাথকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল মাত্র তেরো বছরের ব্যবধানে একটি পিছিয়ে পড়া দেশের আমূল রূপান্তর।
সর্বমানবের মুক্তি: তিনি দেখেছিলেন, বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় চাষা, মজুর, মুটে থেকে শুরু করে সমাজের সব স্তরের মানুষকে যোগ্যতা ও অধিকারের মাপকাঠিতে সমান অবস্থানে আনার চেষ্টা চলছে। যে সার্বিক মানবিক বিকাশকে তিনি আজীবন প্রায় অসাধ্য বলে মনে করতেন, সোভিয়েত সমাজতন্ত্রে তা বাস্তবে রূপ পাচ্ছিল।
অর্থের আধিপত্য বিনাশ: রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, সম্পদ যখন সামাজিক দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে কেবল ব্যক্তিগত ভোগে পরিণত হয়, তখনই সমাজে চরম বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতা দেখা দেয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অর্থ মানুষকে সম্মান দেয় না, বরং বৃহত্তর সমাজকে অপমানিত করে। রাশিয়ায় এই ধনগত বৈষম্যের তিরোভাব ও সম্পদের সামাজিকীকরণের প্রয়াস তাঁকে গভীরভাবে আশান্বিত করেছিল।
শিক্ষার সর্বব্যাপকতা: 'সভ্যতার পিলসুজ'-দের আলোর বৃত্তে আনা
রবীন্দ্রনাথের সমাজ-দর্শনে পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি ছিল শিক্ষা। তিনি ভারতীয় সমাজের খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষকে "সভ্যতার পিলসুজ" হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন—যাঁরা মাথায় প্রদীপ বহন করে দাঁড়িয়ে থাকে, উপরের সবাই সেই আলো পায়, কিন্তু তাঁদের নিজেদের গা বেয়ে কেবল তেলই গড়িয়ে পড়ে।
রাশিয়ায় গিয়ে তিনি দেখলেন, সেই বঞ্চিত পিলসুজদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে গেছে। ভারতের চরম অশিক্ষা ও বঞ্চনার কথা মাথায় রেখে তিনি গভীর আক্ষেপ ও মুগ্ধতার সঙ্গে লেখেন:
"আমাদের সকল সমস্যার সবচেয়ে বড় রাস্তা হচ্ছে শিক্ষা। এতকাল সমাজের অধিকাংশ লোক শিক্ষার পূর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত... এখানে এই শিক্ষা যে কী আশ্চর্য উদ্যমে সমাজের সর্বত্র ব্যাপ্ত হচ্ছে তা দেখলে বিস্মিত হতে হয়। কোনো মানুষই যাতে নিঃসহায় ও নিষ্কর্মা হয়ে না থাকে এজন্য কী প্রচুর আয়োজন ও কী বিপুল উদ্যম।"
ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে কবির নিজস্ব দর্শন ও সমালোচনা
সোভিয়েত রাশিয়ার অভাবনীয় সাফল্যের অকুণ্ঠ প্রশংসা করলেও, রবীন্দ্রনাথ কিন্তু বলশেভিক ব্যবস্থার অন্ধ স্তাবক ছিলেন না। একজন সত্যনিষ্ঠ দার্শনিকের মতোই তিনি এর ত্রুটিগুলোও নির্দ্বিধায় তুলে ধরেছিলেন:
সমষ্টি বনাম ব্যষ্টি: রাশিয়ার সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তির নিজস্ব মতাদর্শ ও স্বাধীনতার উপর রাষ্ট্রের যে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল, তা রবীন্দ্রনাথ মেনে নিতে পারেননি। গ্রন্থের উপসংহারে তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন, "যেখানে ব্যষ্টি উপেক্ষিত, সেখানে সমষ্টির উন্নতি দীর্ঘদিনের জন্য স্থায়ী নয়।"
আত্মিক উৎকর্ষের প্রয়োজনীয়তা: তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে বা বলশেভিক নীতি চাপিয়ে সাময়িকভাবে সমাজের রুগ্ন অবস্থার উপশম করা যেতে পারে, কিন্তু ব্যক্তির নিজস্ব আত্মিক ও মানসিক উৎকর্ষ ছাড়া কোনো সমাজতন্ত্রই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। এই নিজস্ব মানবিক দর্শনই তাঁকে গোঁড়া মার্কসবাদীদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছিল।
ভারতের প্রেক্ষাপটে 'রাশিয়ার চিঠি'র প্রাসঙ্গিকতা
রবীন্দ্রনাথ তাঁর এই অভিজ্ঞতাকে নিছক এক বিদেশি ভ্রমণকাহিনি হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেননি। পরাধীন ভারতবর্ষের শোষণ, চরম দারিদ্র্য, বর্ণবৈষম্য এবং সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকারে নিমজ্জিত সমাজের সামনে তিনি এটিকে একটি বিকল্প পথের দিশা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। রাশিয়ায় কৃষি ও জীবনবিস্তারের যে অভূতপূর্ব উন্নতি তিনি দেখেছিলেন, সেই আদলেই তিনি শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের শিক্ষাব্যবস্থা এবং পল্লী-উন্নয়নের কাজকে নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্যক্তিগত স্বার্থকে বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের অনুগত করতে পারলেই ভারতবর্ষের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব।
বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের ইতিহাসে—যেমন 'য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র' (১৮৮১), 'জাপান যাত্রী' (১৯১৯) বা 'পথের সঞ্চয়' (১৯৩৯)—'রাশিয়ার চিঠি' সম্পূর্ণ এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। এটি কেবল সমাজতন্ত্রের একটি সাহিত্যিক দলিল নয়, বরং এটি এক বিশ্বমানবের দৃষ্টিতে দেখা নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন, যেখানে মানুষের মর্যাদা, অধিকার এবং শিক্ষার আলো কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির কুক্ষিগত নয়, বরং সর্বজনীন।


