দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের সাম্প্রতিক নির্বাচনী লড়াই রাজ্যের সমকালীন রাজনীতিতে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের জন্ম দিল। ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী, এই কেন্দ্রে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রার্থী ডেবাংসু পাণ্ডা এক বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু এই হারের খতিয়ানের আড়ালেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) তথা সিপিআই(এম) প্রার্থী শম্ভুনাথ কুর্মীর লড়াই। চতুর্থ রাউন্ডের গণনা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত পর্ব পর্যন্ত বামেদের প্রাপ্ত ভোট ও মাঠের লড়াই স্পষ্ট করে দিচ্ছে—ফলতার মাটি থেকে লাল পতাকাকে উপড়ে ফেলা এত সহজ নয়। চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও বামেদের এই ভোট বৃদ্ধি আগামী দিনে দক্ষিণ ২৪ পরগনার লাল শিবিরের ঘুরে দাঁড়ানোর এক নতুন বার্তা বহন করছে।
গণনার ভাঙা-গড়া এবং বামেদের ধারাবাহিকতা
গণনাকেন্দ্রের রাউন্ডভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, লড়াইটি শুরু থেকেই একতরফা ছিল না। চতুর্থ রাউন্ডের শেষে বিজেপি প্রার্থী ডেবাংসু পাণ্ডা যখন ২৫,৪৩৮ ভোট পেয়ে জয়ের দিকে এগোচ্ছিলেন, ঠিক তখনই সিপিএম প্রার্থী শম্ভুনাথ কুর্মী ১১,৩৪৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানটি মজবুত করেন। আগের রাউন্ডের ৭,৩৪৬ ভোটের সঙ্গে চতুর্থ রাউন্ডেই আরও ৩,৯৯৯ ভোট যোগ করে বামেরা প্রমাণ করে দেয়, গ্রামীণ ও শ্রমজীবী মানুষের একটি বড় অংশ এখনও কাস্তে-হাতুড়ি-তারা চিহ্নের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন না।
এর বিপরীতে, একদা এই অঞ্চলের শাসক দল হিসেবে পরিচিত তৃণমূল কংগ্রেস কিংবা শতাব্দীপ্রাচীন কংগ্রেসের অবস্থান ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। চতুর্থ রাউন্ডের শেষে তৃণমূলের জাহাঙ্গীর খান মাত্র ১,৪০৫ এবং কংগ্রেসের আব্দুর রজ্জাক মোল্লা মাত্র ২,৯৯৬ ভোট পেয়ে লড়াই থেকে কার্যত ছিটকে যান। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, ফলতায় বিজেপির প্রধান ও একমাত্র চ্যালেঞ্জার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে বামেরাই।
প্রতিকূলতার প্রাচীর ভেঙে বুথ স্তরের সংগঠন রক্ষা
দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে বামেদের জন্য গত এক দশক মোটেও মসৃণ ছিল না। শাসক দলের একাধিপত্য, বুথ দখল এবং লাগাতার সন্ত্রাসের অভিযোগে যেখানে বিরোধীদের কোণঠাসা হয়ে পড়ার চেনা ছবি দেখা যায়, সেখানে ফলতার এই পুনর্নির্বাচনে সিপিএমের এই ভোটপ্রাপ্তি এক বড় সাংগঠনিক সাফল্য।
স্থানীয় বাম সমর্থকদের মতে, এই ভোট স্রেফ কোনো সংখ্যা নয়, এটি হলো বুথ স্তরে কর্মীদের টিকে থাকার লড়াই। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনেও এই অঞ্চলে বামেদের ভোটব্যাঙ্ক যেখানে তলানিতে ঠেকেছিল, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এই উপনির্বাচনে প্রতিটি রাউন্ডে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ভোট বাড়ানো—বামেদের পুনর্গঠনের চেষ্টারই ফসল। শম্ভুনাথ কুর্মীর এই লড়াই প্রমাণ করেছে যে, দলের নিচু তলার কর্মীরা এখনও মাঠ ছাড়েননি এবং শাসক ও বিরোধী—উভয় শিবিরের মেরুকরণের রাজনীতিকে উপেক্ষা করেই বামেরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
তৃণমূলের বিপর্যয় ও বামেদের রাজনৈতিক শূন্যস্থান পূরণ
ফলতার এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দিক হলো তৃণমূল কংগ্রেসের নজিরবিহীন দুর্বল অবস্থান। যে জেলায় একসময় ঘাসফুল শিবিরের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, সেখানে শাসক দলের প্রার্থীর এই করুণ দশা রাজনৈতিক মহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, শাসক দলের প্রতি মানুষের ক্ষোভ এবং প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়াকে কংগ্রেস বা অন্য কোনো দল নয়, বরং সিপিএম-ই নিজেদের পক্ষে টানতে সফল হয়েছে। বিজেপি-বিরোধী যে ধর্মনিরপেক্ষ ও বিকল্প রাজনীতির শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল, বামেরা সেই শূন্যস্থান পূরণে অনেকটাই সফল।
হারের মধ্যেও লুকিয়ে থাকা ভবিষ্যৎ বার্তা
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শেষ কথা বলে জয়-পরাজয়ের সংখ্যা। সেই নিরিখে বিজেপি প্রার্থী ডেবাংসু পাণ্ডার জয় অনস্বীকার্য এবং তাঁর এই বড় লিড বিজেপির সাংগঠনিক শক্তিরই পরিচয় দেয়। কিন্তু ফলতার এই লড়াই শুধু আজকের জয়ের জন্য ছিল না, এটি ছিল আগামী দিনের রাজনীতির জমি তৈরির লড়াই।
ফলতার এই নির্বাচনী চিত্র বাম শিবিরের জন্য তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে:
১. নির্দিষ্ট ভোটভিত্তি পুনরুদ্ধার: শত প্রলোভন ও চাপের মুখেও বামেদের একটি নির্দিষ্ট ও বিশ্বস্ত ভোটব্যাঙ্ক এখনও অটুট।
২. দক্ষিণ ২৪ পরগনায় অস্তিত্ব রক্ষা: ভাঙড়, ক্যানিং বা ফলতার মতো কঠিন জোনেও বামেদের সাংগঠনিক কাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি।
৩. বিকল্প শক্তির উত্থান: বিজেপি-বিরোধী লড়াইয়ে তৃণমূলের ব্যর্থতার দিনে সিপিএম-ই একমাত্র বিকল্প হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে।
নির্বাচনী রাজনীতিতে অনেক সময় শুধু জয়ের চেয়ে লড়াইয়ের ধরনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলতায় সিপিএমের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছে। চূড়ান্ত ফলাফলে হয়তো লাল আবির ওড়েনি, কিন্তু গেরুয়া ঝড়ের মধ্যেও যেভাবে বাম সমর্থকেরা নিজেদের দুর্গ পাহারা দিয়েছেন এবং দ্বিতীয় স্থান ছিনিয়ে নিয়েছেন, তা আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের বাম রাজনীতির জন্য এক নতুন সঞ্জীবনী সুধা হয়ে উঠতে পারে। ফলতা প্রমাণ করল—বামেরা এখনও ফুরিয়ে যায়নি, বরং নতুন শক্তিতে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে।


