আজ ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ), বাংলাদেশের জাতীয় কবি ও বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত 'বিদ্রোহী কবি' কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী।
বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আজ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হচ্ছে মানবতা ও সাম্যের এই মহান কবিকে।
সাহিত্যে অবদান ও শিক্ষার প্রসারে ভূমিকা
প্রথাগত শিক্ষায় বেশিদূর এগোতে না পারলেও, কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বাংলা সাহিত্য ও সমাজ সংস্কারের এক অনন্য আলোকবর্তিকা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যকে এক সম্পূর্ণ নতুন এবং সাধারণ মানুষের উপযোগী রূপ দিয়েছিলেন।
গণমানুষের ভাষা: সংস্কৃত-নির্ভর অভিজাত ভাষার বদলে তিনি সাধারণ মানুষের বোধগম্য লোকজ বাংলা এবং আরবি-ফারসি শব্দের সার্থক মিশ্রণ ঘটান, যার ফলে সাহিত্য প্রথমবারের মতো প্রান্তিক মুসলিম ও সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়।
নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন: ১৯৩০-এর দশকেই তিনি নারী শিক্ষার পক্ষে জোরালো আওয়াজ তোলেন। তাঁর বিখ্যাত "নারী" এবং "জাগো নারী বহ্নি শিখা" কবিতা নারী ক্ষমতায়নের অন্যতম শক্তিশালী দলিল।
স্বশিক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: চরম দারিদ্র্যের কারণে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হলেও, নিজের চেষ্টায় তিনি হয়ে ওঠেন অসামান্য পণ্ডিত। তাঁর রচিত ৪০০০-এর বেশি 'নজরুলগীতি', কবিতা, নাটক ও প্রবন্ধ বাংলা সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ।
ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা: তিনি বরাবরই বিজ্ঞানভিত্তিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে কথা বলেছেন।
মার্কসবাদ ও শ্রেণি সংগ্রামের চেতনা
কাজী নজরুল ইসলামের বৈপ্লবিক চিন্তাধারার সাথে মার্কসবাদের এক গভীর মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। তিনি ছিলেন গ্রামীণ সর্বহারা শ্রেণি থেকে উঠে আসা এক বিরল প্রতিভা, যিনি শোষণ ও বঞ্চনাকে খুব কাছ থেকে অনুভব করেছিলেন।
রুশ বিপ্লবের প্রভাব: ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব তাঁর রাজনৈতিক চেতনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, যা তাঁকে পুঁজিবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আরও সোচ্চার করে তোলে।
শ্রেণি সংগ্রাম: 'সাম্যবাদী' (১৯২৫) এবং 'সর্বহারা' (১৯২৬) কবিতায় তিনি সরাসরি শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তাঁর সাম্যবাদী চেতনায় জমিদার ও পুঁজিপতিদের শোষণের কড়া সমালোচনা ছিল।
শ্রমিক স্বরাজ পার্টি ও 'লাঙল': ১৯২৫ সালে কমরেড মুজফফর আহমদের সাথে মিলে তিনি গঠন করেন 'লেবার স্বরাজ পার্টি'। তাঁদের মুখপত্র 'লাঙল' পত্রিকায় তিনি ভারতে প্রথমবারের মতো কাস্তে-হাতুড়ি প্রতীকের ব্যবহার করেন এবং কার্ল মার্কসের জীবনী ও লেনিনকে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।
তবে নজরুল যান্ত্রিক মার্কসবাদী ছিলেন না। তিনি ছিলেন 'বিপ্লবী দেশজ মানবতাবাদী', যিনি মার্কসীয় দর্শনের সাথে বাংলার লোকজ আধ্যাত্মিকতার অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নজরুলের সাহিত্যকর্ম এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের প্রধান ভাষা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান (২০২৪): বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নজরুলের কবিতা ও গান ছিল তরুণদের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা। ঢাকার দেয়ালগুলোতে নজরুলের বিদ্রোহী পংক্তির গ্রাফিতি ছাত্র সমাজকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সাহস যুগিয়েছে।
আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি: গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকার গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের 'জাতীয় কবি' হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি (পশ্চিমবঙ্গ): ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও বর্তমান মেরুকরণের রাজনীতিতে নজরুলের আদর্শ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি একই হাতে যেমন ইসলামিক গজল লিখেছেন, তেমনি রচনা করেছেন শ্যামাসংগীত। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এই অসাম্প্রদায়িক বার্তাকে বর্তমান সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


