নিজস্ব প্রতিবেদন: বাংলার মাটিতে বামপন্থী রাজনীতির শিকড় একসময় প্রোথিত ছিল কারখানার ধুলোয় আর কৃষকের ঘামে। একসময় গঙ্গার তীরের চটকল থেকে শুরু করে দুর্গাপুর-আসানসোল শিল্পাঞ্চলের ইস্পাত কারখানাগুলোতে যে অধিকারবাদের চর্চা ছিল, তা আজ অনেকটাই ফ্যাকাসে। একসময়ের সেই আপসহীন লড়াইয়ের ময়দান থেকে কমিউনিস্ট পার্টির এই সরে আসা কি নেহাতই সময়ের বদল, নাকি নীতিগত বিচ্যুতি? দীর্ঘদিনের এই 'শ্রেণি বিমুখতা' যে বাম রাজনীতিকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের থেকে যোজন দূরে সরিয়ে দিয়েছে, তা আজ আর কোনো গোপন বিষয় নয়।
আন্দোলনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: লড়াইয়ের ময়দান থেকে আলোচনার টেবিলে
বাম রাজনীতির একটা বড় অংশ দাঁড়িয়ে ছিল শ্রমিক আন্দোলনের ওপর। কিন্তু বিগত কয়েক দশকে সেই আন্দোলনের ধরনে এক আমূল পরিবর্তন এসেছে।
বিক্ষোভের অবসান: একসময় কারখানার গেটে বা রাজপথে যে 'অজিটেশন' বা গণবিক্ষোভ শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের প্রধান হাতিয়ার ছিল, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে এসেছে।
চুক্তিনির্ভরতা: শ্রমিকদের প্রকৃত যন্ত্রণাকে রাস্তায় তুলে ধরার বদলে, মালিকপক্ষের সঙ্গে 'বেতন চুক্তি' বা আইনি আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের প্রবণতা বেড়েছে।
সংগঠনে বহিরাগতদের ভিড়: শ্রমিক সংগঠনগুলোর সম্মেলন বা নীতি নির্ধারণী মঞ্চে এখন প্রকৃত শ্রমিকদের চেয়ে ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর (যেমন ছাত্র, যুব বা বুদ্ধিজীবী সংগঠন) প্রতিনিধিদের বেশি দেখা যায়। ফলে যে শ্রমিকের ঘামে কারখানা চলে, তাঁর নিজস্ব যন্ত্রণার কথা বলার পরিসরটা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে।
এই আলোচনার টেবিলে বসে অধিকার আদায়ের প্রক্রিয়ায় হয়তো কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে, কিন্তু হারিয়ে গেছে সেই পুরনো দিনের আপসহীন লড়াইয়ের আগুন।
নেতৃত্বে মধ্যবিত্তের আধিপত্য: শ্রেণি সংগ্রামের পথে কাঁটা?
সমাজ বদলের লড়াইয়ে কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম বড় তাত্ত্বিক সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের নেতৃত্ব কাঠামো।
পার্টির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা স্তর পর্যন্ত শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত পরিমণ্ডলের মানুষের অতিরিক্ত আধিপত্য একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
মধ্যবিত্ত সমাজের একটা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো চরমপন্থার বদলে স্থিতাবস্থা বা আপসের পথে হাঁটা। সমাজ বদলের লড়াইয়ে এই শ্রেণির মানুষের অগ্রাধিকার যত বেড়েছে, আপসহীন লড়াইয়ের তেজ ততই কমেছে। তাত্ত্বিক জ্ঞানের নিরিখে এঁরা হয়তো সমৃদ্ধ, কিন্তু দিনমজুর বা কারখানার শ্রমিকের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার যে সংগ্রাম, তার সঙ্গে এঁদের নাড়ির টান অনেকটাই আলগা। ফলে পার্টির সঙ্গে নিচুতলার মানুষের একটা মানসিক ও শ্রেণিগত দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
বিজেপির 'সাবঅল্টার্ন' কৌশল: মুখোশ না কি নতুন সমীকরণ?
বামপন্থীদের এই শ্রেণি বিমুখতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন কৌশল আমদানি করেছে বিজেপি। দীর্ঘদিন ধরে যে প্রান্তিক বা সাবঅল্টার্ন শ্রেণি বামেদের ভোটব্যাঙ্ক ছিল, বিজেপি এখন অত্যন্ত সুকৌশলে সেই শ্রেণির 'বন্ধু' সাজার চেষ্টা করছে।
তারা এমন সব মুখকে সামনে তুলে আনছে, যাঁদের জীবনসংগ্রাম সাধারণ মানুষের খুব কাছের:
কলিতা মাঝি: শালতোড়ার মতো জায়গা থেকে এক দিনমজুর পরিবারের সদস্যকে বিধায়ক করে আনা।
রেখা পাত্র ও রত্না দেবনাথ: সন্দেশখালি বা অন্যান্য এলাকার অত্যাচারিত, প্রান্তিক পরিবারের মুখকে সামনে রেখে শোষিত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, বিজেপির এই পদক্ষেপ আদতে একটি 'মুখোশ'। এর পেছনে সমাজ বদলের কোনো প্রকৃত উদ্দেশ্য নেই, বরং রয়েছে স্রেফ ভোট রাজনীতির অঙ্ক। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এই মুখোশ পরে হলেও তারা অত্যন্ত সফলভাবে শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করছে এবং অনেকটাই সফল হয়েছে।
পুনরুত্থানের টার্নিং পয়েন্ট: শেকড়ে ফেরার ডাক
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলায় বামপন্থার পুনরুত্থান কোনো ম্যাজিকের ওপর নির্ভরশীল নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি কাঠামোগত ও আদর্শগত রদবদল।
শ্রমজীবী শ্রেণির কাছে ফেরা: মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমের তাত্ত্বিক আলোচনার গণ্ডি পেরিয়ে পার্টিকে আবার সেই কারখানার গেটে, চাষের মাঠে এবং প্রান্তিক মানুষের উঠোনে ফিরে যেতে হবে।
সুবিধা-বঞ্চিতদের (Less Privileged) বিশ্বস্ত বন্ধু হওয়া: শুধু ভোট পাওয়ার তাগিদে নয়, দৈনন্দিন জীবনযুদ্ধে সুবিধা-বঞ্চিত মানুষের সত্যিকারের ও বিশ্বস্ত বন্ধু হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
নেতৃত্বে ভারসাম্য: তাত্ত্বিক বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি এমন নেতাদের সামনে আনতে হবে যাঁরা সরাসরি মাটি থেকে উঠে এসেছেন এবং যাঁদের শরীরে খেটে খাওয়া মানুষের গন্ধ লেগে আছে।
বামেদের ঘুরে দাঁড়ানোর এই লড়াইটা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু শ্রেণি বিমুখতা কাটিয়ে, আপসহীন লড়াইয়ের পুরনো তেজ ফিরিয়ে এনে যদি তারা ফের শ্রমজীবী মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে, তবে সেটাই হবে বাংলার রাজনীতিতে বাম পুনরুত্থানের সবথেকে বড় 'টার্নিং পয়েন্ট'।


