বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা: ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের ঠিক দু'দিন আগে রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন নাটকীয় মোড়। শেষ মুহূর্তে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী জাহাঙ্গীর খান তাঁর মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করে নেওয়ায় এক ধাক্কায় বদলে গেল দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই আসনের রাজনৈতিক সমীকরণ। দলীয় সূত্রে এটিকে ‘ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত’ বলে দাবি করা হলেও, রাজনৈতিক মহল এই ঘটনাকে ফলতার লড়াইয়ে বাম ও বিজেপির মধ্যে এক নতুন মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে।
তৃণমূলের আচমকা সরে দাঁড়ানো: কৌশলগত ক্ষতি নাকি অন্য কিছু?
ভোটের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে জাহাঙ্গীর খানের সরে দাঁড়ানোকে তৃণমূলের জন্য একটি বড় কৌশলগত ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রত্যাহারের ফলে মাঠে সরাসরি লড়াইয়ের ধরনটাই পুরোপুরি বদলে গেছে। তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, প্রার্থী কেন হঠাৎ মনোনয়ন তুলে নিলেন, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও তাঁদের কাছে স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে, বিরোধী শিবির একে রাজনৈতিক চাপের ফল হিসেবেই ব্যাখ্যা করছে।
২০২১ সালের প্রেক্ষাপট: কেমন ছিল ফলতার শক্তিপ্রদর্শন?
গত ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই আসনে তৃণমূলের ভিত্তি কতটা মজবুত ছিল। তবে একই সাথে বিজেপির উপস্থিতিও উড়িয়ে দেওয়ার মতো ছিল না।
২০২১ সালের ভোটের পরিসংখ্যান:
শংকর কুমার নস্কর (তৃণমূল): ১,১৭,১৭৯ ভোট (বিজয়ী)
বিধান পারুই (বিজেপি): ৭৬,৪০৫ ভোট
আব্দুর রজ্জাক মোল্লা (কংগ্রেস): ৭,৪৫২ ভোট
ব্যবধান: তৃণমূল বিজেপির চেয়ে ৪০,৭৭৪ ভোটে এগিয়ে ছিল।
বিশ্লেষণ: ২০২১ সালের এই ফল প্রমাণ করে যে ফলতায় বিজেপির একটি নিজস্ব ও শক্তিশালী ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে। তবে সেবার তৃণমূলের বিশাল ব্যবধানে জয়ী হওয়ার কারণে বিরোধীরা সুবিধা করতে পারেনি।
বাম শিবিরের জন্য ‘চাঁদের আলো’: পুনর্গঠনের সুবর্ণ সুযোগ
শাসক দলের প্রার্থী মাঠে না থাকায় বাম শিবিরের সামনে এক বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে এই আসনে বামেরা অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় ছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, তৃণমূল-বিরোধী ও ক্ষুব্ধ ভোটারদের একটা বড় অংশ যদি বাম প্রার্থী শম্ভু নাথ কর্মীর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তা বিজেপির ভোটব্যাঙ্কে বড়সড় ধস নামাতে পারে। এই উপনির্বাচন তাই বামেদের জন্য নিজেদের সংগঠনকে পুনর্গঠন করার এক অ্যাসিড টেস্ট।
বিজেপির বিরুদ্ধে নতুন সমীকরণ: লড়াই এবার সমানে-সমানে?
ফলতা উপনির্বাচনের মূল চাবিকাঠি এখন বিজেপির ভোটব্যাঙ্কের ওপর নির্ভর করছে। ২০২১ সালে দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিজেপির শক্তিকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। সমীকরণ বলছে:
যদি তৃণমূলের অনুপস্থিতিতে বিরোধী ভোটগুলো ছড়িয়ে পড়ে, তবে তার সুবিধা সরাসরি পাবে বিজেপি।
আর যদি তৃণমূল-বিরোধী এবং শাসক দলের একাংশের ভোট বামেদের বাক্সে যায়, তবে ফলতায় বাম-বিজেপির এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখতে পাওয়া যাবে।
সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ফলতা উপনির্বাচন আর পাঁচটা সাধারণ উপনির্বাচনের মতো নয়। এটি আদতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সামগ্রিক বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ করতে চলেছে। ২০২১ সালের তুলনায় এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ ময়দানে মূল শাসক দলই অনুপস্থিত। ফলে লড়াই এখন পুরোপুরি বাম বনাম বিজেপির মধ্যে কেন্দ্রীভূত। এখন দেখার, তৃণমূলের এই শূন্যতায় তৈরি হওয়া ভোটব্যাঙ্ক শেষ পর্যন্ত কোন দিকে হেলে— বামেদের দিকে, নাকি পদ্ম শিবিরে? উত্তর মিলবে ভোটবাক্স খুললেই।


