পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নতুন আর্থিক সহায়তা প্রকল্প ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ চালুর আগেই শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক। মাসে ₹৩,০০০ আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, প্রকল্পের আবেদন ফর্ম ঘিরে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন। বিশেষ করে ১২ পাতার দীর্ঘ ফর্ম এবং তাতে চাওয়া ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ১ জুন থেকে শুরু হবে এই প্রকল্পের আবেদন গ্রহণ প্রক্রিয়া। অনলাইন ও অফলাইন— দুইভাবেই আবেদন করা যাবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, আর্থিক সহায়তার একটি প্রকল্পে এত বিশদ তথ্য কেন চাওয়া হচ্ছে?
১২ পাতার ফর্মে কী কী তথ্য চাওয়া হয়েছে?
অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্মে শুধু আবেদনকারীর নয়, পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। নাম, জন্মতারিখ, আধার নম্বর, ভোটার কার্ড, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, IFSC কোড থেকে শুরু করে শিক্ষাগত যোগ্যতা পর্যন্ত উল্লেখ করতে হবে।
এছাড়াও জানতে চাওয়া হয়েছে—
- পরিবারে পাকা বাড়ি আছে কি না
- জমির পরিমাণ কত
- চার চাকার গাড়ি রয়েছে কি না
- PAN কার্ড ও আয়করের তথ্য
- সন্তানদের স্কুলের নাম
- CAA-র আওতায় আবেদন হয়েছে কি না
- SIR প্রক্রিয়ায় কারও নাম বাদ পড়েছে কি না
এইসব তথ্য কেন প্রয়োজন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে প্রশ্ন।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন— “এ কি আর্থিক প্রকল্প, না তথ্য সংগ্রহ অভিযান?”
রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ইতিমধ্যেই ফর্ম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের অভিযোগ, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো সহজ প্রক্রিয়ার পরিবর্তে এবার অত্যন্ত জটিল আবেদন ব্যবস্থা আনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এত বেশি তথ্য সংগ্রহের ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারেন। বিশেষ করে গ্রামের প্রবীণ মহিলা বা কম শিক্ষিত আবেদনকারীদের জন্য এই ফর্ম পূরণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—
- এত ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে?
- পরিবারভিত্তিক তথ্য কি অন্য কোনও কাজে ব্যবহার করা হবে?
- CAA বা SIR সংক্রান্ত প্রশ্ন কেন রাখা হয়েছে?
- আবেদন যাচাই করতে প্রশাসনের কত সময় লাগবে?
রাজনৈতিক মহলেও শুরু বিতর্ক
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগ, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের বিশাল ডেটাবেস তৈরি করার চেষ্টা চলছে। যদিও সরকারপক্ষের দাবি, প্রকৃত উপভোক্তাদের চিহ্নিত করতেই বিস্তারিত তথ্য নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি মহলের বক্তব্য, “ভুয়ো আবেদন আটকাতে এবং প্রকৃত প্রাপকদের কাছে সুবিধা পৌঁছে দিতেই এই ব্যবস্থা।”
তবে বিরোধীদের প্রশ্ন, “যদি লক্ষ্য শুধুই আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়, তাহলে ১২ পাতার এত জটিল ফর্মের প্রয়োজন কী?”
কারা আবেদন করতে পারবেন?
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী—
- পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা মহিলা হতে হবে
- বয়স ২৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে
- ভোটার তালিকায় নাম থাকতে হবে
- আধার-লিঙ্ক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে
অন্যদিকে সরকারি কর্মী, আয়করদাতা, আধা-সরকারি কর্মচারী বা পঞ্চায়েত/পুরসভার কর্মীরা এই প্রকল্পের আওতায় আসবেন না।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সঙ্গে সম্পর্ক কী?
সরকারি সূত্রের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের উপভোক্তাদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। তবে নতুন আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ ফর্ম জমা বাধ্যতামূলক।
এই কারণেই অনেকের প্রশ্ন— “যদি আগের ডেটাবেস থেকেই তথ্য থাকে, তাহলে আবার এত বিশদ তথ্য কেন চাওয়া হচ্ছে?”
আবেদন প্রক্রিয়া শুরু ১ জুন
আগামী ১ জুন থেকে তিন মাস ধরে আবেদন গ্রহণ চলবে। স্থানীয় BDO অফিস, মহকুমাশাসক দপ্তর এবং শহরাঞ্চলে পুরসভা আবেদন যাচাই করবে বলে জানা গিয়েছে।
এখন দেখার, সাধারণ মানুষের প্রশ্ন ও উদ্বেগের জবাবে সরকার কী ব্যাখ্যা দেয় এবং প্রকল্পটি বাস্তবে কতটা সফল হয়।


