দুর্গাপুর, ১৩ জুলাই: প্রবল বর্ষণের মধ্যেও উৎসাহে কোনও ভাটা পড়েনি। কাদামাখা মাঠ আর অবিরাম বৃষ্টিকে সঙ্গী করেই শুরু হল ৩৬তম শহিদ কমরেড নিমাই অধিকারী ও প্রয়াত কমরেড পরিতোষ ভট্টাচার্য স্মৃতি ফুটবল প্রতিযোগিতা-২০২৬। লালা লাজপত রায় রোডের ট্রাঙ্ক রোড সংলগ্ন মাঠে অনুষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে ইউনাইটেড কনজিউমার্স ওয়েলফেয়ার ইউনিয়ন, দুর্গাপুর, সহযোগিতায় দুর্গাপুর টাউন ক্লাব।
এই প্রতিযোগিতা শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়, শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস, আত্মত্যাগ এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক। শহিদ কমরেড নিমাই অধিকারী ও প্রয়াত কমরেড পরিতোষ ভট্টাচার্যের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং সম্প্রীতি, ঐক্য ও ক্রীড়া-সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই প্রতি বছর এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের প্রকাশিত লিফলেটে উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার ঠিকা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে গিয়ে ১৯৯০ সালের ৩০ জুলাই শহিদ হন কমরেড নিমাই অধিকারী। তাঁর আত্মত্যাগ এবং প্রয়াত কমরেড পরিতোষ ভট্টাচার্যের সংগ্রামী আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই এই স্মৃতি ফুটবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয় সুভাষ চন্দ্র বয়েজ ক্লাব এবং তানসেন এ.সি.। বৃষ্টির কারণে মাঠ ভারী হয়ে পড়লেও ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে সুভাষ চন্দ্র বয়েজ ক্লাব। প্রথম থেকেই প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে তারা।
ম্যাচের প্রথম গোলটি আসে ১৪ নম্বর জার্সিধারী কাজল মান্ডির পা থেকে। নিখুঁত ফিনিশিংয়ে তিনি দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। এরপর আক্রমণের ধার বজায় রেখে ৬ নম্বর জার্সিধারী শিবম বাউরি দৃষ্টিনন্দন গোল করে ব্যবধান বাড়িয়ে ২-০ করেন। প্রথমার্ধের শেষে এই স্কোরলাইন নিয়েই ড্রেসিংরুমে ফেরে দুই দল।
যদিও বলের দখলের লড়াইয়ে কিছুটা এগিয়ে ছিল তানসেন এ.সি., কিন্তু সেই আধিপত্যকে কার্যকর আক্রমণে রূপ দিতে পারেনি তারা। অন্যদিকে সুভাষ চন্দ্র বয়েজ ক্লাব সুযোগ তৈরি এবং ফিনিশিং—দুই ক্ষেত্রেই ছিল অনেক বেশি সফল। প্রথমার্ধে তারা পাঁচটি গোলমুখী শট নেয়, যেখানে তানসেনের ঝুলিতে ছিল মাত্র একটি শট।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচে ফেরার লক্ষ্যে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করে তানসেন। একের পর এক আক্রমণ গড়ে তুললেও সুভাষ চন্দ্র বয়েজ ক্লাবের রক্ষণভাগ ছিল অনবদ্য। উল্টোদিকে দ্রুত পাল্টা আক্রমণ থেকে ৭ নম্বর জার্সিধারী সুদীপ্ত টুডু দুর্দান্ত গোল করে ব্যবধান ৩-০ করেন। এই গোলের পর ম্যাচ কার্যত সুভাষ চন্দ্র বয়েজ ক্লাবের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
তবে শেষ পর্যন্ত লড়াই ছাড়েনি তানসেন এ.সি.। একটি কর্নার কিক থেকে ১৯ নম্বর জার্সিধারী শান্তনু কর্মকার অসাধারণ হেডে গোল করে ব্যবধান কমিয়ে ৩-১ করেন। তাঁর এই দৃষ্টিনন্দন গোল দর্শকদের করতালি কুড়ালেও ম্যাচে আর প্রত্যাবর্তন সম্ভব হয়নি।
নির্ধারিত সময়ের শেষে ৩-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত সূচনা করে সুভাষ চন্দ্র বয়েজ ক্লাব।
ম্যাচে প্রথম গোল করার পাশাপাশি আক্রমণভাগে দুর্দান্ত নৈপুণ্য, গতি এবং বল নিয়ন্ত্রণের জন্য সুভাষ চন্দ্র বয়েজ ক্লাবের ১৪ নম্বর জার্সিধারী কাজল মান্ডি নির্বাচিত হন ম্যান অব দ্য ম্যাচ।
প্রবল বর্ষণের মধ্যেও মাঠে উপস্থিত দর্শকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। খেলোয়াড়দের লড়াকু মানসিকতা, আয়োজকদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচকে স্মরণীয় করে তোলে। শ্রমিক আন্দোলনের আত্মত্যাগের ইতিহাসকে স্মরণ করার পাশাপাশি খেলাধুলার মাধ্যমে সম্প্রীতি ও ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার যে লক্ষ্য নিয়ে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন, তারই সফল সূচনা হল এদিনের উদ্বোধনী ম্যাচে।












