করাচি, মে ২০২৬: পাকিস্তানের প্রখ্যাত ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী এবং নারী অধিকার আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব সীমা কিরমানি সম্প্রতি করাচি পুলিশের হাতে হেনস্থার শিকার হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এসেছেন। ৭৫ বছর বয়সী এই শিল্পীকে পুলিশের টেনে-হিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানে তোলার ভিডিও ভাইরাল হতেই বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
গত ৫ মে, করাচি প্রেস ক্লাবের সামনে ‘অউরাত মার্চ’-এর (Aurat March) উদ্যোক্তারা মাদার্স ডে বা মা দিবস উপলক্ষে একটি পদযাত্রার অনুমতির দাবিতে জড়ো হয়েছিলেন। সেই সময় করাচি পুলিশ সীমা কিরমানিসহ সাতজন নারী কর্মীকে আটক করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, মহিলা পুলিশ কর্মীরা প্রবীণ এই শিল্পীকে অত্যন্ত অভব্যভাবে ধাক্কা দিয়ে এবং টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
তীব্র প্রতিক্রিয়া ও প্রশাসনের পদক্ষেপ
এই ঘটনার ভিডিও দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে মানবাধিকার কর্মী এবং শিল্পীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। প্রতিবাদের মুখে সিন্ধু প্রদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জিয়াউল হাসান লানজার দ্রুত হস্তক্ষেপ করেন এবং সীমা কিরমানিকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন। কর্তব্যে গাফিলতি ও অভব্য আচরণের অভিযোগে একজন মহিলা এসএইচও (SHO) এবং একজন ডিএসপি-সহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে মুক্তি পাওয়ার পর সীমা কিরমানি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সংবাদ সম্মেলন করেন এবং সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানান।
কে এই সীমা কিরমানি
১৯৫১ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে জন্ম নেওয়া সীমা কিরমানি কেবল একজন নৃত্যশিল্পীই নন, তিনি পাকিস্তানের নারী মুক্তি আন্দোলনের এক জীবন্ত প্রতীক।
নৃত্যের মাধ্যমে প্রতিবাদ: জেনারেল জিয়া-উল-হকের আমলে যখন পাকিস্তানে নৃত্য নিষিদ্ধ ছিল, তখন তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারতনাট্যম, কত্থক এবং ওডিশি নৃত্য পরিবেশন করে গেছেন। তাঁর কাছে নাচ ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা।
তেহরিক-ই-নিসওয়ান: ১৯৭৯ সালে তিনি ‘তেহরিক-ই-নিসওয়ান’ (নারী আন্দোলন) নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলেন, যা গত চার দশক ধরে শিল্পকলা ও নাটকের মাধ্যমে নারীর অধিকার রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।
বিশ্বজোড়া পরিচিতি: সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিখ্যাত গান ‘পাসুরি’ (Pasoori)-র মিউজিক ভিডিওতে তাঁর অনবদ্য ভারতনাট্যম পরিবেশনা তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক সম্মাননা
মানবাধিকার ও শান্তিস্থাপনে তাঁর অবদানের জন্য ২০০৫ সালে তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত ‘১০০০ শান্তি নারী’র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এছাড়াও তিনি ‘আচা পিস স্টার অ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘কারজিয়াস ওম্যান অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত হয়েছেন।
৭৫ বছর বয়সেও সীমা কিরমানির এই হার না মানা মনোভাব প্রমাণ করে যে, শিল্পের শক্তি ও ন্যায়ের লড়াইকে কোনো দমন-পীড়ন দিয়ে থামিয়ে রাখা যায় না। করাচির এই ঘটনা পাকিস্তানের বর্তমান প্রশাসনিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর আবারও প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিল।


