কলকাতা, ১৫ মে, ২০২৬: পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই এক ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত বড়সড় সিদ্ধান্ত নিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ঘটে যাওয়া আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নির্মম ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড মামলার তদন্তে গাফিলতি এবং একাধিক গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে ৩ জন সিনিয়র আইপিএস (IPS) অফিসারকে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করেছে নবগঠিত বিজেপি সরকার।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আজ রাজ্য সচিবালয়ে (নবান্ন) একটি সাংবাদিক বৈঠক করে এই চরম সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন।
যে ৩ আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে:
১. বিনীত গোয়েল — কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার (CP)
২. ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় — প্রাক্তন ডেপুটি কমিশনার (DC)
৩. অভিষেক গুপ্ত — প্রাক্তন ডেপুটি কমিশনার (DC)
অফিসারদের বিরুদ্ধে ওঠা প্রধান ৩টি অভিযোগ:
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই তিন শীর্ষ পুলিশ কর্তার বিরুদ্ধে মূলত তিনটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে:
তদন্তে চরম গাফিলতি: ২০২৪ সালের ৮-৯ আগস্টের সেই অভিশপ্ত রাতে আরজি করের ঘটনার পর প্রাথমিক তদন্তে চরম অবহেলা, গাফিলতি এবং তথ্যপ্রমাণ লোপাটের চেষ্টার (কভার-আপ) অভিযোগ উঠেছে এই অফিসারদের বিরুদ্ধে।
পীড়িতার পরিবারকে ঘুষের প্রস্তাব: সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হলো, ঘটনার পর বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে বা প্রভাবিত করতে নির্যাতিতার বাবা-মাকে টাকার প্রলোভন বা ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এই আধিকারিকরা।
অননুমোদিত সাংবাদিক বৈঠক: নিয়ম বহির্ভূতভাবে এই মামলার বিষয়ে একটি অননুমোদিত প্রেস কনফারেন্স করেছিলেন তারা। এর আগে প্রাক্তন সিপি বিনীত গোয়েল নির্যাতিতার পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য কলকাতা হাইকোর্টের তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়েছিলেন এবং আদালতে ক্ষমাও চেয়েছিলেন।
বিশেষ সংযুক্তি: এই মামলার অন্যতম সাজাপ্রাপ্ত সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়ও এর আগে দাবি করেছিল যে, বিনীত গোয়েল তাকে "ফাঁসানোর চক্রান্ত" করেছিলেন এবং এর পেছনে বড় বড় অফিসাররা যুক্ত ছিলেন। যদিও এই দাবির কোনো সরকারি সত্যতা মেলেনি, তবে এটি জনমানসে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
কীভাবে নেওয়া হলো এই সিদ্ধান্ত?
পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের মুখ্যসচিবকে আরজি কর কাণ্ডে পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখে একটি প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। সেই রিপোর্ট জমা পড়ার পর, কলকাতা পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের দায়িত্বে চরম অবহেলা ও অসদাচরণের প্রমাণ মেলায় মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে এই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ ও তদন্তের পরিধি
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রাজ্য সরকার মূল অপরাধের ফৌজদারি তদন্তে কোনো হস্তক্ষেপ করছে না।
মূল অপরাধের তদন্তটি সিবিআই (CBI) করছে এবং তা সরাসরি আদালতের নজরদারিতে রয়েছে।
রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপটি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও বিভাগীয় (Departmental)।
মুখ্যসচিবের তত্ত্বাবধানে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব (Home Secretary) এই তিন অফিসারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপের নেতৃত্ব দেবেন।
মায়ের দেওয়া কথা রাখলেন শুভেন্দু
শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তাঁর মা গায়ত্রী অধিকারী জনসমক্ষে জানিয়েছিলেন যে, তাঁর ছেলের সবচেয়ে বড় এবং প্রথম দায়িত্ব হলো আরজি করের নির্যাতিতা "তিলোত্তমা"র বিচার সুনিশ্চিত করা। দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে এই বড় ধাক্কা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে এবং নিজের পরিবারের কাছে করা সেই নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণ করলেন বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।


