প্রবীণ ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, সিটু (CITU)-এর সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি এবং শ্রমিক শ্রেণির অকৃত্রিম বন্ধু, কমরেড বিষ্ণু মহান্তি গত ৯ মে, ২০২৬ তারিখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। বেশ কিছুদিন ধরে ডায়াবেটিস সংক্রান্ত জটিলতায় ভোগার পর, ভুবনেশ্বরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে (KIMS) ভোর আনুমানিক ৩:১৫ মিনিটে তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁর এই প্রয়াণের মধ্য দিয়ে ওড়িশার, বিশেষত শিল্পশহর রাউরকেলার, শ্রমিক আন্দোলনের এক বর্ণময় অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
রাউরকেলায় শেষযাত্রা: জনসমুদ্রে পরিণত হল পথঘাট
শনিবার সন্ধ্যায় তাঁর নশ্বর দেহ কয়ডা, কালতা, রক্সি এবং রাজামুণ্ডা চক হয়ে রাউরকেলায় নিয়ে আসা হয়। রবিবার (১০ মে) সকালে তাঁর শেষযাত্রায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী থাকে রাউরকেলা। প্রিয় নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে অগণিত মানুষের ঢল নামে রাস্তায়। আক্ষরিক অর্থেই এক জনসমুদ্রের সৃষ্টি হয়।
ছেন্ড-এ তাঁর বাসভবন থেকে শুরু হওয়া এক বিশাল শোকমিছিল প্রথমে সকাল ৯টায় শক্তিনগরের সিপিআই(এম) পার্টি অফিসে এবং পরে সকাল ১০টায় সেক্টর-১৬ এর শ্রমিক ভবন (সিটু জেলা কার্যালয়)-এ পৌঁছায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং হাজার হাজার সাধারণ শ্রমিক তাঁদের প্রিয় 'কমরেড'-কে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ভিড় জমান। বিপুল জনসমাগম এবং আবেগঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে তাঁর মৃতদেহ বেদব্যাসে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
শোকস্তব্ধ রাজ্য এবং সর্বস্তরের শ্রদ্ধা
তাঁর মৃত্যুতে রাজ্যজুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সিটু-র পক্ষ থেকে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রেখে এই প্রিয় নেতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানো হয়। সিপিআই(এম) (CPI-M) এবং অন্যান্য ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ তাঁর প্রয়াণকে শ্রমিক আন্দোলনের জন্য "এক অপূরণীয় ক্ষতি" বলে বর্ণনা করেছেন। রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ দিলীপ রায়, বিধায়ক দুর্গাচরণ তাঁতি এবং বিধায়ক সারদা নায়েকও তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
পাঁচ দশকের নিরলস সংগ্রাম ও অবদান
ওড়িশায় স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে শ্রমিক আন্দোলনে বিষ্ণু মহান্তির অবদান অবিস্মরণীয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এবং পরবর্তীতে তা জাতীয় স্তরের নেতৃত্বে উন্নীত হয়:
ছাত্র রাজনীতি ও কারাবরণ: স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (SFI)-এর হাত ধরে ছাত্ররাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি রাউরকেলা সরকারি কলেজ এবং রাউরকেলা ল কলেজের ছাত্র সংসদের তিনবার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময় তিনি ২৪ মাস কারাবরণ করেন, যা গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি তাঁর বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছিল।
টানা ২৬ বছরের নেতৃত্ব: ২০০০ সাল থেকে ২০২৬ সালে আমৃত্যু, দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে তিনি সিটু (CITU) ওড়িশার রাজ্য সাধারণ সম্পাদক হিসেবে একটানা দায়িত্ব পালন করেছেন।
অসংগঠিত শ্রমিকদের সংগঠিত করা: বালাসোরে পরিবহন কর্মীদের সংগঠিত করা থেকে শুরু করে অঙ্গনওয়াড়ি, আশা কর্মী, মিড-ডে মিল এবং নির্মাণ কর্মীদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। কৃষকদের আন্দোলনের সাথেও তিনি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন।
রাউরকেলা স্টিল প্ল্যান্ট আন্দোলন: রাউরকেলা স্টিল প্ল্যান্টে (SAIL) চুক্তিবদ্ধ (কন্ট্রাক্ট) শ্রমিকদের স্থায়ীকরণ এবং অধিকার আদায়ের জন্য তাঁর দীর্ঘস্থায়ী ও আপসহীন আন্দোলন ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই আন্দোলনের কারণে তাঁকে জেলও খাটতে হয়েছিল।
গণআন্দোলনের রূপকার: তালচের-বিমলাগড় নতুন রেললাইনের দাবিতে দীর্ঘস্থায়ী গণআন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন, যা ওড়িশার কয়লা খনি অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা: এমপ্লয়িজ স্টেট ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশনের (ESIC) আঞ্চলিক বোর্ড সদস্য হিসেবে তিনি শিল্প শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরিষেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরলস কাজ করেছেন।
কমরেড বিষ্ণু মহান্তি কেবল একজন সিপিআই(এম) নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন দলমত নির্বিশেষে সব মানুষের কাছে একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব এবং আপসহীন লড়াকু নেতা। তাঁর প্রয়াণে ওড়িশার খেটে খাওয়া মানুষ তাঁদের এক অকৃত্রিম অভিভাবককে হারাল।





