নয়াদিল্লি, : ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় সামাজিক সমতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক রায় দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আজ, ১৬ মে ২০০৮-এ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কলকাতা হাইকোর্টের সেই নির্দেশটি খারিজ করে দিয়েছে যা ওবিসি কোটায় ভর্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। এর ফলে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট কলকাতা (IIM-C)-তে ২৭% কোটা নীতি মেনেই অনগ্রসর শ্রেণীর (OBC) শিক্ষার্থীদের ভর্তির পথ পরিষ্কার হলো।
এর আগে গত ১০ এপ্রিল ২০০৮ তারিখে অশোক কুমার ঠাকুর বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া মামলায় প্রধান বিচারপতি কে.জি. বালকৃষ্ণানের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে আইআইটি (IIT), আইআইএম (IIM), এইমস (AIIMS) এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (CEIs) ওবিসিদের জন্য ২৭% সংরক্ষণের সাংবিধানিক বৈধতা বহাল রেখেছিল। আজকের নির্দেশটি সেই ঐতিহাসিক রায়েরই ধারাবাহিকতা।
আইনি ভিত্তি ও সংরক্ষণের বিন্যাস
সুপ্রিম কোর্ট ২০০৫ সালের সংবিধান (৯৩তম সংশোধন) আইন এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (ভর্তিতে সংরক্ষণ) আইন, ২০০৬-এর বৈধতা স্বীকার করেছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে যে, এই আইনগুলো সংবিধানের মূল কাঠামোকে কোনোভাবেই লঙ্ঘন করে না। এই রায়ের ফলে ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষ থেকেই ওবিসি কোটা চালু করার সবুজ সংকেত মিলল। এর ফলে কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট সংরক্ষণের পরিমাণ দাঁড়াল ৪৯.৫%।
সংরক্ষণের বর্তমান বিন্যাস:
তফসিলি জাতি (SC): ১৫%
তফসিলি উপজাতি (ST): ৭.৫%
অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী (OBC): ২৭%
আদালতের বেঁধে দেওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত
সংরক্ষণের বৈধতা বহাল রাখলেও, সুপ্রিম কোর্ট এর সুষ্ঠু প্রয়োগের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আরোপ করেছে:
'ক্রিমি লেয়ার' (Creamy Layer) বহিষ্কার: ওবিসি সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে উন্নত (১৯৯৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বরের অফিস স্মারকলিপি অনুযায়ী), তারা এই সংরক্ষণের সুবিধা পাবেন না।
পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনা: সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা এবং কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য প্রতি পাঁচ বছরে একবার এই নীতি পর্যালোচনা করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
ব্যক্তিগত ও সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান: বেসরকারি অনুদানহীন এবং সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই কোটার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
কাট-অফ মার্কসের ব্যবধান: সাধারণ শ্রেণী এবং ওবিসি প্রার্থীদের মধ্যে কাট-অফ নম্বরের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তি সংক্রান্ত বিতর্ক অবসান
স্নাতকোত্তর (PG) কোর্সে এই কোটা প্রযোজ্য হবে কিনা তা নিয়ে প্রাথমিকভাবে কিছু দ্বিমত তৈরি হয়েছিল। বিচারপতি দলবীর ভান্ডারী তাঁর পৃথক মতামতে উল্লেখ করেছিলেন যে, একজন প্রার্থী স্নাতক হওয়ার পর তিনি "শিক্ষাগতভাবে অগ্রসর" হয়ে যান, তাই স্নাতকোত্তর স্তরে ওবিসি কোটার সুবিধা তাঁর নাও পেতে পারেন। তবে, আজকের (১৬ মে) আদেশে সুপ্রিম কোর্ট কলকাতা হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা সরাসরি খারিজ করে দেয় এবং আইআইএম-কলকাতার স্নাতকোত্তর স্তরেই ২৭% ওবিসি কোটা কার্যকর করার অনুমতি দেয়। এর ফলে উচ্চশিক্ষায় সংরক্ষণের পরিধি নিয়ে তৈরি হওয়া সমস্ত ধোঁয়াশা কেটে গেল।


