নয়াদিল্লি/কলকাতা: রেলের জমি নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের আবহে আবারও সামনে এসেছে এক পুরনো প্রশ্ন—রেলের জমি আসলে কার? যে জমিতে আজ রেললাইন, স্টেশন কিংবা বিভিন্ন প্রকল্প গড়ে উঠেছে, তার বড় অংশই এসেছে কৃষকদের কাছ থেকে অধিগ্রহণের মাধ্যমে। ফলে সেই জমির ব্যবহার ও মালিকানা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে অনেকেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন বাংলা সাহিত্যপত্র প্রবাসী-র ১৩২০ বঙ্গাব্দের একটি মন্তব্য। সেখানে বলা হয়েছিল, “এই যে রেললাইন, ইহা পাথরের উপর নহে, দেশের ত্রিশ কোটি কৃষকের বক্ষের উপর পাতা আছে।” এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে সেই বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা আজও অটুট বলে মনে করছেন সমালোচকরা।
স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রেল পরিষেবার সম্প্রসারণের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সেই জমির বড় অংশই এসেছে কৃষকদের কাছ থেকে। কিন্তু পরবর্তীকালে রেলের অব্যবহৃত জমিকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য কর্পোরেট সংস্থাগুলির হাতে দীর্ঘমেয়াদি লিজে তুলে দেওয়ার নীতিকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে।
২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত ‘ভিশন-২০২০’ নথিতে তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বাক্ষরিত ৬.৩ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, রেলের কার্যক্রমে প্রয়োজন নেই এমন অব্যবহৃত জমির বাণিজ্যিক ব্যবহার রেলের উন্নয়নের জন্য স্থায়ী রাজস্বের উৎস হতে পারে। সেই নীতির ভিত্তিতেই বিভিন্ন প্রকল্পে রেলের জমি দীর্ঘমেয়াদি লিজে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এছাড়াও ২০১০ সালে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে রেল অবকাঠামো উন্নয়নে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। নতুন রেললাইন, বন্দর সংযোগ, কয়লাখনি এলাকা, পর্যটন কেন্দ্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রেল সংযোগ তৈরির ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হয়েছিল।
রেল মন্ত্রকের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী ই. আহমদ রাজ্যসভায় এক লিখিত জবাবে জানিয়েছিলেন, বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য রেলের উন্নত জমি লিজ দিয়ে কয়েকশো কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। সেই সময় দিল্লির সরাই রোহিলায় আবাসন প্রকল্পের জন্য ৮০ বছরের এবং মুম্বইয়ে একটি বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ৯০ বছরের লিজ দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।
সমালোচকদের প্রশ্ন, যে কৃষকদের জমি অধিগ্রহণ করে এই সম্পদ তৈরি হয়েছে, সেই জমি থেকে অর্জিত আয় বা লাভের কোনও অংশ কি কখনও জমিহারা কৃষকদের কাছে পৌঁছেছে? নাকি উন্নয়নের নামে অধিগৃহীত জমি শেষ পর্যন্ত কর্পোরেট মুনাফার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে?
রেলের জমির ব্যবহার, কৃষকদের অধিকার এবং সরকারি সম্পদের বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে এই বিতর্ক আগামী দিনে আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে।


