মুম্বই/বিড, মহারাষ্ট্র: বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিনি উৎপাদনকারী দেশ ভারত। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লক্ষ লক্ষ কৃষক ও শ্রমিকের জীবন-জীবিকা। কিন্তু মহারাষ্ট্রের মারাঠওয়াড়া অঞ্চলের আখক্ষেতগুলিতে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এক মানবিক সংকট সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অভিযোগ, কাজের চাপ, ঋণের বোঝা এবং শ্রম শোষণের ফলে বহু নারী শ্রমিক অল্প বয়সেই জরায়ু অপসারণ (হিস্টেরেকটমি) করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ঋণ, দারিদ্র্য ও শ্রমের শৃঙ্খল
মহারাষ্ট্রের বিড, ওসমানাবাদ, সোলাপুর ও সাংলি জেলার হাজার হাজার পরিবার প্রতি বছর আখ কাটার মরশুমে বিভিন্ন চিনিকলে কাজ করতে যান। শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে স্থানীয় ঠিকাদার বা ‘মুকাদ্দাম’ ব্যবস্থা। শ্রমিকদের আগাম অর্থ বা ‘উচল’ দেওয়া হয়, যা পরে শ্রমের মাধ্যমে শোধ করতে হয়।
শ্রমিকদের অভিযোগ, এই ব্যবস্থার ফলে তারা কার্যত ঋণের ফাঁদে আটকে পড়েন। স্বামী-স্ত্রীকে একটি ইউনিট হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে পরিবারের একজন অসুস্থ হলে পুরো ইউনিটের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিতির জন্য জরিমানাও দিতে হয় বলে বিভিন্ন গবেষণা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন বাড়ছে হিস্টেরেকটমি?
অধিকারকর্মী ও গবেষকদের মতে, মাসিকের সময় কাজ বন্ধ রাখতে না পারা, চিকিৎসা পরিষেবার অভাব এবং নিয়মিত মজুরি হারানোর আশঙ্কা বহু নারীকে হিস্টেরেকটমির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকারের তদন্তে বিড জেলায় বিপুল সংখ্যক হিস্টেরেকটমির ঘটনা সামনে আসে। পরবর্তী গবেষণাগুলিও দেখায় যে আখক্ষেতের পরিযায়ী নারী শ্রমিকদের মধ্যে জরায়ু অপসারণের হার সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, আখক্ষেতে পরিযায়ী শ্রমে যুক্ত পরিবারগুলির নারীদের মধ্যে হিস্টেরেকটমির হার একই অঞ্চলের অন্যান্য নারীদের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। গবেষকরা এই প্রবণতার সঙ্গে দারিদ্র্য, ঋণ এবং অনিশ্চিত কর্মপরিবেশের সরাসরি সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন।
স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
চিকিৎসকদের মতে, প্রয়োজন ছাড়া কম বয়সে জরায়ু অপসারণ গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে। এর ফলে অকাল মেনোপজ, হাড়ের ক্ষয়, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, হরমোনজনিত সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
গ্রামীণ নারীদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, অস্ত্রোপচারের পরও তাদের কঠোর শ্রম থেকে অব্যাহতি মেলেনি। বরং ঋণের বোঝা শোধ করতে আরও বেশি সময় কাজ করতে হয়েছে।
জলবায়ু সংকটের প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মারাঠওয়াড়া অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি খরা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কৃষিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে বহু পরিবার স্থানীয় জীবিকা হারিয়ে আখক্ষেতের পরিযায়ী শ্রমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
গবেষকদের মতে, জলবায়ু সংকট, কৃষি বিপর্যয়, দারিদ্র্য, ঋণ এবং শ্রম শোষণ—এই সমস্ত কারণ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নারীদের জন্য এক জটিল সংকট তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনের প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে ভারতের বিভিন্ন চিনিকল থেকে উৎপাদিত চিনি বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা হয় এবং বহু বহুজাতিক খাদ্য ও পানীয় সংস্থার সরবরাহ শৃঙ্খলেও পৌঁছায়। ফলে শ্রমিকদের এই দুর্দশা কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও তুলে দিয়েছে।
সরকারি উদ্যোগ ও বিতর্ক
মহারাষ্ট্র সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলিতে হিস্টেরেকটমির ওপর নজরদারি বাড়ানোর জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ের চিকিৎসা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
তবে শ্রমিক সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, শুধুমাত্র অস্ত্রোপচারের অনুমোদন নিয়ন্ত্রণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মুকাদ্দাম ব্যবস্থা, ঋণের ফাঁদ, অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার অভাব দূর না করলে সংকট বহাল থাকবে।
অধিকারকর্মীদের দাবি
অধিকারকর্মীরা আখশ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিতকরণ, অসুস্থতার কারণে অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে জরিমানা বন্ধ এবং শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলির সরবরাহ শৃঙ্খলে শ্রম অধিকার পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভারতের অর্থনীতিতে চিনি শিল্পের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই মিষ্টতার আড়ালে যদি হাজার হাজার নারীকে নিজেদের শরীরের অঙ্গ বিসর্জন দিতে হয়, তাহলে উন্নয়নের প্রকৃত মূল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিড জেলার আখক্ষেত আজ সেই কঠিন প্রশ্নই দেশের সামনে তুলে ধরছে।


