নিজস্ব প্রতিবেদন, ৯ জুলাই ২০২৬: উত্তরপ্রদেশের মিরাটে বিএ পড়ুয়া ললিতা গৌতমের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ন্যায়বিচারের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে জনমানস। ললিতার পরিবার ও বিভিন্ন সংগঠনের অভিযোগ, প্রশাসন ও পুলিশ এই মামলাটি গুরুত্বের সাথে দেখছে না, যা রাজ্যে নারী নিরাপত্তার দাবিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আন্দোলনের ওপর কঠোর পুলিশি দমন
বুধবার (৮ জুলাই) ললিতা গৌতমের জন্য আয়োজিত ‘দলিত মহাপঞ্চায়েত’কে কেন্দ্র করে মিরাট কালেক্টরেটের সামনে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ললিতার পরিবারের সাথে যোগ দিয়ে হাজারো মানুষ যখন ন্যায়বিচারের দাবি তুলছিলেন, তখন পুলিশ প্রশাসন বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেয়।
পুলিশি লাঠিচার্জ: বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে, যার ফলে অনেক আন্দোলনকারী আহত হন।
এসএসপি-র বিতর্কিত ভূমিকা: সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, মিরাটের সিনিয়র পুলিশ সুপার (এসএসপি) অবিনাশ পাণ্ডে আটক বিক্ষোভকারী রবি গৌতমকে পুলিশ ভ্যানের ভেতরে সজোরে চড় মারছেন। এই ঘটনাটি পুলিশের স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা নিয়ে বড়সড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
আইনি পাল্টা ব্যবস্থা: পুলিশ কেবল লাঠিচার্জ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং কংগ্রেস নেতা হেমন্ত প্রধানসহ প্রায় ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। পুলিশের অভিযোগ, ‘বাইরের অরাজক উপাদান’ বিক্ষোভের নামে শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট করার চেষ্টা করছিল।
নারী নিরাপত্তা ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ললিতা হত্যা মামলার তদন্তে পুলিশের ভূমিকা শুরু থেকেই সমালোচনার মুখে পড়েছে। পরিবারের দাবি, হত্যার পর অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ধারায় মামলা না করা এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ: নিহত ছাত্রীর মা সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে, পুলিশ ঘটনার পর থেকে পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। তাঁদের দাবি, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও অন্যান্য তথ্যপ্রমাণে গাফিলতি রয়েছে।
রাজনৈতিক সমালোচনা: সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, “বিজেপি শাসনে পুলিশ অন্যায়ের রেকর্ড ভাঙছে। ললিতার পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার চাওয়ার বদলে পুলিশ তাদের ওপরই দমনপীড়ন চালাচ্ছে।”
বুলডোজার সংস্কৃতি বনাম ন্যায়বিচার
উত্তরপ্রদেশে অপরাধীদের দমনে যে ‘বুলডোজার জাস্টিস’ বা কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথা সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়, ললিতা গৌতমের পরিবারের পক্ষ থেকেও অভিযুক্তদের বাড়িতে বুলডোজার চালানোর দাবি উঠেছে। কিন্তু সেই দাবি পূরণ দূরে থাক, বরং বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত মানুষদেরই এখন আইনি জালে জড়ানো হচ্ছে।
এই ঘটনাটি আবারও প্রকাশ্যে এনেছে যে, রাজ্যে ‘মিশন শক্তি’-র মতো নারী নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও, যখন কোনো গুরুতর অপরাধ ঘটে, তখন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ন্যায়বিচারের দাবির বদলে যখন পুলিশের লাঠির সামনে সাধারণ মানুষকে দাঁড়াতে হয়, তখন রাজ্যের নারী নিরাপত্তার পুরো কাঠামোটিই সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি করছে।
বর্তমানে মিরাটের পরিস্থিতি থমথমে। ললিতার পরিবার এবং আন্দোলনরত সংগঠনগুলো এখনও তাদের দাবিতে অনড়। পুলিশ যদিও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করছে, কিন্তু এসএসপি-র এই বিতর্কিত আচরণের জেরে প্রশাসন সাধারণ মানুষের কতটা আস্থা ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন থেকে গেছে।




