বিশেষ প্রতিবেদন, কোচবিহার:
রাজ্যজুড়ে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতার আবহে ফের একবার শিরোনামে কোচবিহারের শীতলকুচি। মঙ্গলবার সকালে মৃত সিপিআইএম কর্মী মন্টু মিঞার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে ফেরার পথে ডিওয়াইএফআই নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জীর গাড়িতে ডিম হামলার অভিযোগ উঠল। শীতলকুচি থানার ঠিক সামনেই এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতে নিন্দার ঝড় উঠেছে। গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী নেত্রীর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার চূড়ান্ত নিদর্শন হিসেবে দেখছেন অনেকে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
কয়েক দিন আগেই শীতলকুচি এলাকায় মন্টু মিঞা নামে এক সিপিআইএম কর্মীর মৃতদেহ উদ্ধার হয়।
মীনাক্ষীর প্রতিবাদ ও অবস্থানের হুমকি
এই আকস্মিক হামলায় কনভয় থমকে গেলেও বিচলিত হননি মীনাক্ষী। গাড়ি থেকেই পরিস্থিতি নিজের মোবাইলে রেকর্ড করেন তিনি এবং সরাসরি পুলিশের নিষ্ক্রিয়তাকে কাঠগড়ায় তোলেন। নেত্রীর স্পষ্ট বার্তা ছিল, "রাস্তায় চলাফেরা করাও কি আর নিরাপদ নয়? পুলিশ কেন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে?" হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার না করলে তিনি সেখান থেকে নড়বেন না বলেও হুঁশিয়ারি দেন। মীনাক্ষীর এই অনড় অবস্থানের মুখে পড়ে এবং পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে শেষ পর্যন্ত পুলিশ অভিযুক্তদের আটক ও গ্রেফতারের প্রক্রিয়া শুরু করতে বাধ্য হয়।
রাজনৈতিক বিতর্ক ও জনমত
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু এভাবে একজন রাজনৈতিক নেত্রীর ওপর প্রকাশ্যে হামলা কোন ধরনের সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ?
অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচনের পর থেকে রাজ্যে যে 'ডিম ছোঁড়া' বা 'ডিম থেরাপি'র রাজনীতি শুরু হয়েছে, এটি তারই বর্ধিত সংস্করণ। এর আগে সোনারপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলাও দায়ের হয়েছিল।
পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন
হামলার সময় পুলিশি উপস্থিতির পরেও কেন অভিযুক্তরা তৎক্ষণাৎ ধরা পড়ল না—সেই প্রশ্নই বড় হয়ে উঠছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, পুলিশ যদি প্রথম থেকেই কঠোর হতো, তবে এমন ঔদ্ধত্য দেখানোর সাহস কেউ পেত না। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় যেন অপরাধীকে আড়াল করার ঢাল না হয়, সেই দাবিই এখন সর্বজনীন।
গণতন্ত্রের পথে কি কাঁটা?
গণতন্ত্রে ভিন্নমত পোষণ করা নাগরিক অধিকার, কিন্তু সেই ভিন্নমতকে হিংসা দিয়ে দাবানোর চেষ্টা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মীনাক্ষী মুখার্জীর মতো একজন নেত্রীর উপর এই আক্রমণ প্রকারান্তরে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির ইঙ্গিত দেয়।
ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা চাইছেন, কেবল গ্রেফতারই নয়, আইনের শাসন যেন নিশ্চিত হয়। রাজনৈতিক হিংসা ও সন্ত্রাসের পথ পরিহার করে শান্তি ও সহনশীলতার পরিবেশে ফিরে আসাই এখন সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা।
প্রতিবেদকের মন্তব্য: রাজনীতির ময়দানে লড়াই হোক যুক্তি ও নীতিতে, পেশীশক্তি বা ডিম ছোঁড়ার মতো অসভ্য আচরণে নয়। শীতলকুচির ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিল যে, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে কেবল নেত্রীদের নিরাপত্তা নয়, বরং প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের মত প্রকাশের ও নির্ভয়ে চলাফেরার অধিকার রক্ষায় আমাদের আরও সতর্ক ও সোচ্চার হতে হবে।



