বুলডোজার ইট ভাঙতে পারে। ছাদ গুঁড়িয়ে দিতে পারে। লাল পতাকা নামিয়ে দিতে পারে। কিন্তু মানুষের জন্য জ্বলে ওঠা চুলার আগুন কি ভেঙে ফেলা যায়?
হাবড়ায় সিপিআই(এম)-এর যে দলীয় দপ্তরটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে দলের অভিযোগ, সেটি তাদের কাছে শুধু একটি রাজনৈতিক কার্যালয় ছিল না। দলের বক্তব্য অনুযায়ী, উচ্ছেদ হওয়া বহু পরিবার, দিনমজুর, শ্রমজীবী ও অসহায় মানুষের জন্য এই দপ্তর থেকেই প্রতিদিন দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা করা হতো। তাই একটি ভবনের ধ্বংস শুধু ইট-পাথরের ক্ষতি নয়—এটি বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি মানবিক উদ্যোগেরও আঘাত।
কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা অন্য কথা বলে।
বামপন্থা কখনও শুধু অফিসের চার দেওয়ালে বন্দি ছিল না। তার জন্ম হয়েছে কলকারখানার গেটে, ধানের ক্ষেতে, শ্রমিকের ঘামে, ক্ষুধার্ত শিশুর কান্নায় এবং প্রতিবাদী মানুষের মুষ্টিবদ্ধ হাতে। তাই একটি কার্যালয় ভেঙে গেলেও, যদি মানুষের জন্য রান্নার হাঁড়ি আবার চড়ে, যদি স্বেচ্ছাসেবকের হাত আবার ভাতের থালা এগিয়ে দেয়, তাহলে সংগ্রাম থেমে যায় না—বরং নতুন করে শুরু হয়।
সিপিআই(এম)-এর দাবি, দলীয় দপ্তর ভেঙে যাওয়ার পরও বিকল্প জায়গায় আবার সাধারণ মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যদি এই দাবি সত্য হয়, তবে সেটি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একই সঙ্গে, এই ঘটনায় প্রশাসনের বক্তব্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্পূর্ণ চিত্র বুঝতে সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আজ প্রশ্ন কেবল একটি ভবনকে ঘিরে নয়।
প্রশ্ন হলো—দুর্বল মানুষের পাশে কে দাঁড়াবে? ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াইকে কি রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত, নাকি মানবিকতার ভিত্তিতে?
ক্ষমতা আসে, ক্ষমতা যায়। সরকার বদলায়। দল বদলায়। কিন্তু ক্ষুধা বদলায় না। উচ্ছেদ হওয়া মানুষের চোখের জল বদলায় না। যে হাত ভাতের থালা বাড়িয়ে দেয়, সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত সেই হাতকেই মনে রাখে।
একটি অফিস ভেঙে দেওয়া সহজ। কিন্তু মানুষের মনে গড়ে ওঠা বিশ্বাস ভাঙা এত সহজ নয়।
সংগ্রাম কখনও ইটের দেয়ালে লেখা থাকে না। সংগ্রাম লেখা থাকে মানুষের হৃদয়ে। আর যতদিন ক্ষুধার বিরুদ্ধে একটি চুলাও জ্বলবে, ততদিন মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর রাজনীতি বেঁচে থাকবে।




