" " //psuftoum.com/4/5191039 Live Web Directory কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তের ১১৭তম জন্মবার্ষিকী: পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের অন্যতম প্রধান স্থপতি, সংগঠনের অবিস্মরণীয় নির্মাতা //whairtoa.com/4/5181814
Type Here to Get Search Results !

কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তের ১১৭তম জন্মবার্ষিকী: পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের অন্যতম প্রধান স্থপতি, সংগঠনের অবিস্মরণীয় নির্মাতা

 


কলকাতা, ১৩ জুলাই: ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁরা জনসভার মঞ্চে যতটা নয়, তার থেকেও অনেক বেশি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন সংগঠনের ভিতরে। সেই বিরল নেতাদের অন্যতম ছিলেন কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত (১৩ জুলাই ১৯১০ – ২৯ নভেম্বর ১৯৮২)। প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামী, সিপিআই(এম)-এর প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যতম শীর্ষ নেতা, পলিটব্যুরোর সদস্য, আজীবন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক, বামফ্রন্টের প্রথম চেয়ারম্যান এবং ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে তাঁর অবদান ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।


আজ তাঁর ১১৭তম জন্মবার্ষিকীতে বিভিন্ন বামপন্থী রাজনৈতিক দল, গণসংগঠন, শ্রমিক-কৃষক সংগঠন এবং অসংখ্য মানুষ তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন। বিভিন্ন জেলায় মাল্যদান, আলোচনা সভা, স্মরণসভা এবং তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।


স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে কমিউনিস্ট রাজনীতিতে


১৯১০ সালের ১৩ জুলাই অবিভক্ত বাংলায় জন্মগ্রহণ করেন প্রমোদ দাশগুপ্ত। তাঁর পরিবার ছিল শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন। স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে তিনি ব্রিটিশ শাসনের দমন-পীড়নের মুখোমুখি হন। পরবর্তীকালে মার্ক্সবাদী দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির সংগ্রামকে জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন এবং কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন।

স্বাধীনতা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই উপলব্ধিই তাঁকে আজীবন শ্রমিক, কৃষক, খেতমজুর এবং সাধারণ মানুষের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রাখে।


সংগঠনই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি


ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে প্রমোদ দাশগুপ্তকে সর্বাগ্রে স্মরণ করা হয় একজন অসাধারণ সংগঠক হিসেবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, শক্তিশালী সংগঠন ছাড়া কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

১৯৬১ সালে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে সিপিআই(এম) গঠিত হলে সেই দলেরও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই পদে বহাল ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা পলিটব্যুরোর সদস্য ছিলেন।

দলীয় কর্মীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক শিক্ষা, গণসংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত সংগঠন বিস্তারে তাঁর ভূমিকা ছিল অসাধারণ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই(এম)-এর যে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তার প্রধান স্থপতি ছিলেন প্রমোদ দাশগুপ্ত।


নির্বাচনে না লড়েও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু


ভারতীয় রাজনীতিতে প্রমোদ দাশগুপ্তের জীবন একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তিনি কখনও বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হননি। কোনো সরকারি পদ বা মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেননি।

তবুও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রার্থী নির্বাচন, নির্বাচনী কৌশল, জোট রাজনীতি, দলীয় সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তাঁর মতামত ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলের ভিতরে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতার জন্যই তিনি ছিলেন সর্বাধিক সম্মানিত নেতাদের একজন।

বামফ্রন্ট গঠনের মূল কারিগর

১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন বামপন্থী দলকে একত্রিত করে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন প্রমোদ দাশগুপ্ত।


তাঁর নেতৃত্বে সিপিআই(এম), ফরওয়ার্ড ব্লক, আরএসপি, আরসিপিআই, মার্কসবাদী ফরওয়ার্ড ব্লকসহ একাধিক বাম দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে বামফ্রন্ট গঠন করে।


এই জোট গঠনের ক্ষেত্রে তিনি যে সাংগঠনিক নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে "প্রমোদ ফর্মুলা" নামে পরিচিত হয়। কোন আসনে কোন দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, কীভাবে জোটের মধ্যে সমন্বয় বজায় থাকবে এবং শরিকদের মধ্যে বিরোধ এড়ানো যাবে—এসব বিষয়ে তাঁর পরিকল্পনা বামফ্রন্টকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক জোটে পরিণত করে।


১৯৭৭: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়


১৯৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট ২৯৪টির মধ্যে ২৩১টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী হন এবং প্রমোদ দাশগুপ্ত হন বামফ্রন্টের প্রথম চেয়ারম্যান।

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পেছনে জনআন্দোলনের পাশাপাশি প্রমোদ দাশগুপ্তের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক প্রস্তুতি, কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা এবং জোট রাজনীতির কৌশল ছিল অন্যতম প্রধান কারণ।


ভূমি সংস্কার ও অপারেশন বর্গা


ক্ষমতায় আসার পর বামফ্রন্ট সরকারের সবচেয়ে আলোচিত কর্মসূচিগুলির মধ্যে ছিল ভূমি সংস্কার এবং অপারেশন বর্গা

প্রমোদ দাশগুপ্ত এই কর্মসূচির অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে বিবেচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে দলীয় সংগঠন গ্রামাঞ্চলে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

এই কর্মসূচির ফলে—

  • লক্ষ লক্ষ ভূমিহীন কৃষক জমির পাট্টা পান।
  • বিপুল সংখ্যক বর্গাদারের আইনি স্বীকৃতি নিশ্চিত হয়।
  • গ্রামীণ ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসে।
  • পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়।
  • কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

পরবর্তীকালে এই কর্মসূচিগুলি পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারের দীর্ঘ রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


কঠোর শৃঙ্খলা, সরল জীবন


প্রমোদ দাশগুপ্তের ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত সাদামাটা।

তিনি প্রচারের আলো থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন। ব্যক্তিগত বিলাসিতা, ক্ষমতার প্রদর্শন কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিপূজাকে তিনি কখনও প্রশ্রয় দেননি। দলীয় কর্মীদের মধ্যে নিয়মানুবর্তিতা, আত্মত্যাগ এবং জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর তিনি সর্বদা গুরুত্ব দিতেন।

অনেক প্রবীণ বাম নেতা পরবর্তীকালে বলেছেন, "দল আগে, ব্যক্তি পরে"—এই নীতিই ছিল প্রমোদ দাশগুপ্তের রাজনৈতিক জীবনের মূল দর্শন।


উত্তরাধিকার


১৯৮২ সালের ২৯ নভেম্বর চিকিৎসার জন্য বেজিংয়ে অবস্থানকালে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর তৈরি সাংগঠনিক কাঠামো, রাজনৈতিক পরিকল্পনা এবং নেতৃত্ব গড়ে তোলার পদ্ধতি বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের বাম রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে।

জ্যোতি বসু, অনিল বিশ্বাস, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যসহ পরবর্তী প্রজন্মের বহু নেতা তাঁর কাছ থেকে সাংগঠনিক শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন বলে বিভিন্ন সময় উল্লেখ করেছেন।

বর্তমানেও বামপন্থী রাজনীতিতে প্রমোদ দাশগুপ্তকে একজন আদর্শ সংগঠক, কৌশলী রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে স্মরণ করা হয়।

শ্রদ্ধাঞ্জলি

তাঁর ১১৭তম জন্মবার্ষিকীতে বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠন জানিয়েছে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, গণতন্ত্র রক্ষা, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সংগঠনভিত্তিক রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রে প্রমোদ দাশগুপ্তের জীবন ও কর্ম আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী থেকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী কমিউনিস্ট সংগঠকে পরিণত হওয়ার তাঁর যাত্রা শুধু একটি রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস নয়, বরং সংগঠন, আদর্শ, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের এক বিরল দৃষ্টান্ত।


কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তের ১১৭তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

লাল সেলাম কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত।
কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত অমর রহে।

Top Post Ad

Below Post Ad

Hollywood Movies