নয়া দিল্লি: ২০২৪ সালের লোকসভা এবং বিভিন্ন রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও "ভোট চুরি"র চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। নয়া দিল্লির ইন্দিরা ভবনে আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে তিনি ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নির্বাচন কমিশনের (ECI) নিরপেক্ষতা নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন তোলেন।
গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর আঘাত ও শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকা
রাহুল গান্ধী উল্লেখ করেন, ভোট হলো ভারতের সংবিধান, আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। যদি ভোটই চুরি হয়ে থাকে, তবে সংবিধানের শক্তি ক্ষুণ্ণ হয় এবং তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি সমস্ত আইন ও সিদ্ধান্তই বেআইনি হয়ে পড়ে। বিরোধী দলনেতা দাবি করেন যে এই গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো ধ্বংসের পেছনে শীর্ষ নেতৃত্ব যুক্ত এবং ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ভূমিকা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি ও কমিশনের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম
সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে একাধিক অভিযোগ তোলেন:
- মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও "ভোট চুরি"তে সরাসরি মদত দেওয়ার অভিযোগ এনে রাহুল গান্ধী তাঁর অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেন। একই সঙ্গে, তাঁকে "অ্যাপ্রুভার" বা রাজসাক্ষী হওয়ার পরামর্শ দেন।
- কমিশনারদের লিখিত আপত্তি: এক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের সূত্র উল্লেখ করে তিনি জানান, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের দুই কমিশনার অন্তত ১৪ বার ভোটার তালিকায় নাম যোগ করা ও বাদ দেওয়া নিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন।
- কমিশনের ব্যর্থতা: সংবিধান ও ভোটাধিকার রক্ষা করার বদলে কমিশন ভোটার তালিকার ওপর তাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে এবং সঠিক ভোটার তালিকাকে বিশৃঙ্খল ও দূষিত করে ফেলেছে।
- আইনি সুরক্ষার অপব্যবহার: ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পাস হওয়া একটি আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনারদের আইনি তদন্ত থেকে সুরক্ষা (Immunity) দেওয়া হয়েছে এবং নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপে কমিশনার নিয়োগের নিরপেক্ষ প্রক্রিয়াকে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে।
ভোট চুরির দুই মূল পদ্ধতি
সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী জানান যে মূলত দুটি প্রধান উপায়ে দেশে ভোট চুরি চালানো হচ্ছে:
- ভোটার তালিকায় প্রত্যক্ষ কারচুপি (Voter List Tampering):
- পরিকল্পিতভাবে ভোটার তালিকা থেকে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া।
- নতুন ও ভুয়া নাম তালিকায় যুক্ত করা।
- ভোটারদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত করা।
- নির্বাচনী এলাকার (Constituency) সীমানা বিন্যাস পরিবর্তন করা।
- ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM) ভিত্তিক কারচুপি:
- ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি EVM মেশিনে জালিয়াতি চালানো।
নির্দিষ্ট নির্বাচন ও সুনির্দিষ্ট তথ্যের উল্লেখ
রাহুল গান্ধী স্পষ্ট জানান যে তিনি কোনো কাল্পনিক কথা বলছেন না, বরং সুনির্দিষ্ট নথি ও তথ্যের ভিত্তিতেই এই অভিযোগ তুলছেন।
- উল্লেখিত নির্বাচনসমূহ: ২০২৪ সালের জাতীয় লোকসভা নির্বাচন ছাড়াও তিনি হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ় এবং কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেন। পাশাপাশি গুজরাট, উত্তর প্রদেশ এবং নির্দিষ্ট কিছু উপ-নির্বাচনী এলাকার (যেমন মাধেপুরা ও আলন্দ) উদাহরণ টেনে সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের অসন্তোষ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ফলাফল প্রভাবিত করা হচ্ছে তা ব্যাখ্যা করেন।
- তথ্য প্রকাশের প্রতিশ্রুতি: মহারাষ্ট্র, মাধেপুরা, আলন্দ এবং হরিয়ানা নির্বাচনে ভোটার তালিকার অসঙ্গতি সম্পর্কিত তথ্য উপস্থাপন করে তিনি আশ্বাস দেন যে তাঁদের সংগৃহীত সমস্ত প্রমাণ আগামী ৩-৪ মাসের মধ্যে জনগণের সামনে "ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট" (সম্পূর্ণ স্পষ্ট) করে প্রকাশ করা হবে।
বিরোধী জোটের অবস্থান ও আন্দোলন
রাহুল গান্ধী স্পষ্ট বার্তা দেন যে "ভোট চুরি"র বিষয়ে বিরোধী জোটের (INDIA Alliance) সমস্ত শরিক দলগুলোর মধ্যে ১০০% সম্মতি রয়েছে। জনগণের ভোটাধিকার এবং সংবিধান রক্ষা করাকে বিরোধী জোট তাদের পবিত্র দায়িত্ব (Sacred duty) মনে করে। গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো রক্ষার স্বার্থে নীরব না থেকে সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ ও নথি জনসমক্ষে তুলে ধরে বিরোধী দলগুলি একসাথে আন্দোলন ও আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে।


