ত্রিপুরায় গণতন্ত্র অস্তাচলে?
সুকান্ত
১০৩২৩ আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ , সংগীতশিল্পী এবং রাজনৈতিক কর্মী। পিয়ালী চৌধুরীর কথা বলছি। আজ আইজিএম হাসপাতালে আমরা গিয়েছিলাম তাকে দেখতে। বীভৎস রাজনৈতিক সন্ত্রাসের শিকার হয়ে যিনি শরীরে মনে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালে বন্দি হয়ে আছেন। মহড়া ঘর থেকে ফেসবুকে লাইভ অনুষ্ঠান করার সুযোগ নেই।
চাকুরীচ্যুতদের প্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ নেই। আমাদের দেখে অঝোরে কাঁদছিলেন । শারীরিক আঘাতের সাথে যুক্ত হয়েছে মানসিক আঘাত। কোনদিন ভাবতেই পারেননি, এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে জনসমক্ষে জাতীয় সড়কের উপর একজন নারীকে একদল দুষ্কৃতী মারতে পারে। আমাদের দেখে কিছু বলার আগে চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছিল। আমরা বললাম আপনি কাঁদছেন কেন? কাঁদার কথা তো আমাদের সবার। আমাদের লজ্জায় মুখ ঢাকার কথা। এই শহরের প্রতিটি ল্যাম্পপোস্টে ঘরে ঘরে 'সুশাসনের' পোস্টার ঝুলছে । সাথে ছবি। আর ঘরে ঘরে দুঃসাশনের প্রতীক হয়ে আপনি শুয়ে আছেন হাসপাতালে সারা শরীরে যন্ত্রণা নিয়ে। লজ্জায় মুখ ঢাকার কথা সরকারের। লজ্জায় মুখ ঢাকার কথা পুলিশ প্রশাসনের। লজ্জায় মুখ ঢাকার কথা মহিলা কমিশনের। লজ্জায় মুখ ঢাকার কথা বৃহত্তর নাগরিক সমাজের। আস্তে আস্তে ধাতস্থ হয়ে খুব মৃদু কন্ঠে আমাদের জানালেন কি হয়েছিল। বাধার ঘাটে জনসভা ছিল। জনসভা থেকে ফিরছিলেন বাসে করে বাড়িতে। রাস্তায় একদল দুর্বৃত্ত, বাইক বাহিনী , বাস থামায়, বাসের প্রত্যেকটি যাত্রীকে চিরুনি তল্লাশি করে। বাসের মধ্যে পিয়ালি চৌধুরী সহ জনসভা ফেরত একদল মহিলা ছিলেন।
অন্য যাত্রীদের জোর করে নামিয়ে দেওয়া হয়। দু একজন প্রতিবাদ করেছিলেন, তাদের পিঠে মাথায় লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারা হয়। মহিলা যাত্রীদের বাস থেকে টেনে হিচড়ে নামানো হচ্ছিল। বাসের মধ্যে এক যুবক সুশাসনকে ভিডিও করার চেষ্টা করছিল। বাইক বাহিনীর সদস্যদের নজরে পড়া মাত্রই ঐ যুবকের মোবাইল নিমেষেই খন্ড খন্ড হয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খায়। আর যুবকের কাঁধে পড়ে কাঠের ফাইল এর তীব্র প্রহার। কাধের হাড় ভেঙে গেছে। পিয়ালী দিদিমণি কোনক্রমে বাস থেকে নেমে একটা অটোতে উঠে পড়েছিলেন। কিন্তু বাইক বাহিনীর নজরে পরে যান। অটোকে ধাওয়া করে থামানো হয়। তারপর অটো থেকে পিয়ালী চৌধুরীকে চুল ধরে টেনে নামানো হয়। মুখের উপর প্রচন্ড ঘুষি মারা হয়। মাটিতে ফেলে বাইক বাহিনীর সদস্যদের একের পর এক শুধু লাথিই নয় , কাঠের ফাইল দিয়ে পায়ে কোমরে বেধড়ক মারা হতে থাকে। ব্যস্ততম জাতীয় সড়ক দিনদুপুরে সবাই দেখছে। গাড়িগুলো সব ছুটে চলে যাচ্ছে। কেউই এগিয়ে আসছে না। চিৎকার করে বলছে না , এ কোন অন্ধকার।
কোনক্রমে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে নিস্তার পেয়ে ছুটতে থাকেন । সেখান থেকে একজন উদ্ধার করে নিয়ে আসেন হাসপাতালে। আমরা শুনছিলাম আর ভাবছিলাম কোন নরকে আমরা আছি। রাজনীতি করা কি অপরাধ ? গান গাওয়া কি অপরাধ ? নিজেদের হারানো চাকরি ফিরে পাওয়ার জন্য কথা বলা কি অপরাধ ? নির্বাচনে দাঁড়ানো কি অপরাধ? একদল দুর্বৃত্তই কি সবকিছু ঠিক করে দেবে? বাইক বাহিনী বাহিনী কি সবকিছু শাসন করবে ? একজন নারীকে এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে মারা হলো, তার সম্ভ্রম নষ্ট করা, তার শ্লীলতাহানি করা হলো, তাকে অসম্মান করা হলো , তারপরও কোন প্রতিক্রিয়া নেই! অপসংস্কৃতির নিছক কালো অন্ধকারই কি শেষ কথা । একদল যুবক কি একজন নারীকে প্রকাশ্যে মারতে পারে এভাবে। ফ্যাসিবাদ বিবেক বুদ্ধি সংস্কৃতি বিহীন একদল দানবে পরিণত করছে আমাদের ঘরের কিছু যুবককে আমাদের চোখের সামনে । এই দানবরা আগামী দিনে কাউকে রেহাই দেবে না । ত্রিপুরা গণতন্ত্রের বদ্ধভূমি এ কথা বললে খুব কম বলা হয়। এখানে বিরোধী দলের সভা করা বারণ এখানে কথা বলা বারণ । এখানে প্রতিবাদের উপর নিষেধাজ্ঞা। বিরোধীদলের সভা ডাকলে পরেই সভার আগেও পরে চলবে বাইক বাহিনীর বেলাগাম সন্ত্রাস । পুলিশ বাইক বাহিনীকে দেখে হাততালি দেবে ।
জনসভায় আসলে পরে রাত্রিতে বাড়িতে হামলা হবে। ফেরার পথে হামলা হবে, মাথা ফাটবে। বিরোধী দলনেতা কোন দোকানে সামনে দাঁড়ালে , দোকানের মালিক সৌজন্যবশত বসতে চেয়ার দিলে তার জন্য শাস্তি নির্ধারিত থাকবে । কিছুক্ষণ পরেই একদল বাইক বাহিনী হামলে পড়বে দোকানে। শাস্তি দেবে দোকানের মালিককে। নিমেষেই দোকান পরিণত হবে ধ্বংসস্তূপে। সরকার বলবে সুশাসন চলছে। লজ্জাহীনরাও লজ্জা পাবে।
একজন নারী , একজন শিল্পী, একজন রাজনৈতিক কর্মী হাসপাতালে শয্যাশায়ী। আমরা সবাই নিশ্চুপ। দুর্যোধন ও দুঃশাসনরা হার মেনেছে ত্রিপুরার ফ্যাসিস্ট শাসনের কাছে। আমরা পিয়ালী চৌধুরীর অস্পষ্ট কথাগুলো শুনছিলাম । আমরা তাকে বললাম, আপনি আবার মাঠে ফিরে আসুন। এই অন্ধকার চলতে পারে না । চলতে দেওয়া যায় না। এই অন্ধকার থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে। একজন পিয়ালী চৌধুরীর কাছে আমরা গিয়েছিলাম। ত্রিপুরায় রাজনৈতিক সন্ত্রাসে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ রক্তাক্ত হচ্ছেন, আহত হচ্ছেন, অসংখ্য বাড়িঘর তছনছ হচ্ছে। তা সত্ত্বেও মানুষ কিন্তু ভয় ভীতি অগ্রাহ্য করে বুক চিতিয়ে লড়ছেন। সন্ত্রাস শেষ কথা নয়। বাইক বাহিনী দুর্বলতার লক্ষণ। আমাদের সাহস করে এগিয়ে আসতে হবে। যাদের চোখের সামনে একজন নারীকে এভাবে নির্যাতন করা হয়, যারা কথা বলেন না, যারা ন্যস্ত দায়িত্ব পালন করেন না, যারা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকেন, তাদের কিন্তু ইতিহাস ক্ষমা করবে না ।
তাদের বিবেকের কাছে তারা চির অপরাধী হয়ে থাকবে এক ভয়ংকর মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তাদের আগামী দিনগুলো কাটাতে হবে। তাই ক্লীবতা ও ভিরুতায় পদাঘাত করে এগিয়ে আসতে হবে। একজন নির্যাতিতা নারীর সামনে দাঁড়িয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের মাথা হেট হয়ে আসছিল। ফিরে আসার সময় বললাম আপনি আবার ফিরে যাবেন ময়দানে। দুর্বৃত্তরা পালানোর পথ পাবে না। অন্ধকারের অবসান হবেই হবে।


