আইটি সেক্টরে অমানবিক শোষণ: দীপায়নের মৃত্যুতে ফুটে উঠলো শ্রমিকদের আর্তনাদ
ভারতের আইটি শিল্প, যাকে বলা হয় দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, সেখানে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার চিত্র। অতিরিক্ত কাজের চাপ, কর্মস্থলে সুরক্ষার অভাব, আর নিরন্তর মানসিক অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে পড়েছে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক। এই অবস্থার বিরুদ্ধে তারা উচ্চারণ করছেন তিনটি মৌলিক দাবি: "আমাদের দাবি ৮ ঘণ্টা কাজের," "আমাদের দাবি কাজের স্থায়ীত্বের," এবং "আমাদের দাবি কর্মস্থলে সামাজিক সুরক্ষার।" কিন্তু এই দাবিগুলো কি কেউ শুনছে?
দীপায়নের করুণ পরিণতি
গত ১৫ মার্চ, ২০২৫, কলকাতার একটি নামী আইটি কোম্পানির ৪৩ বছর বয়সী কর্মী দীপায়ন ভট্টাচার্য আর সহ্য করতে না পেরে চরম সিদ্ধান্ত নেন। কোম্পানির ১২ তলা ভবন থেকে ঝাঁপ দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। তার সহকর্মীদের মতে, দীপায়ন দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করতেন। ম্যানেজারদের অবিরাম গালিগালাজ, কাজের অমানবিক চাপ, আর পারফরম্যান্সের নামে অপমান তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল। তার এক বন্ধু জানান, "দীপায়ন বলতো, 'আমি আর পারছি না। এটা কাজ নয়, এটা জীবন নষ্ট করা।'"
আইটি সেক্টরে কাজের অবস্থা
আইটি শিল্পে কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভারতের আইটি কর্মীদের ৫৫% প্রতিদিন ১০ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন। অনেকে সপ্তাহে ৬০ থেকে ৭০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজে ব্যয় করেন, যা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। কর্মস্থলে কোনো সামাজিক সুরক্ষা নেই—নেই স্বাস্থ্য বীমা, নেই মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, এমনকি ছুটির নিশ্চয়তাও নেই। ফ্রিল্যান্সার বা চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের অবস্থা আরও শোচনীয়।
শ্রম কোডের প্রভাব
কেন্দ্রীয় সরকার ২০২০ সালে চারটি শ্রম কোড প্রণয়ন করেছে, যার মধ্যে 'কোড অন সোশ্যাল সিকিউরিটি' অন্যতম। কিন্তু শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই কোডগুলো শ্রমিকদের সুরক্ষা বাড়ানোর বদলে কর্পোরেট স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ৮ ঘণ্টা কাজের দিনের আইনি স্বীকৃতি ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে। উল্টে, কিছু রাজ্যে ১৪ ঘণ্টা কাজের প্রস্তাব আনা হয়েছে, যা শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই বিষয়ে নীরব, যদিও রাজ্যের অর্ধেকের বেশি মানুষ এই শোষণের কথা জানে।
মালিকদের অত্যাচার
শ্রম কোড পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার আগেই আইটি কোম্পানিগুলো শ্রমিকদের উপর অতিরিক্ত চাপ বাড়িয়েছে। "ফ্লেক্সিবিলিটি" নামে অতিরিক্ত কর্মী না নিয়ে বিদ্যমান কর্মীদের থেকে বেশি কাজ আদায় করা হচ্ছে। মানসিক অত্যাচারের পাশাপাশি শারীরিক ক্লান্তি এখন নিয়মিত ঘটনা। দীপায়নের মতো অনেকে এই অবস্থায় নিজেকে হারিয়ে ফেলছেন। গত এক বছরে ভারতে আইটি কর্মীদের আত্মহত্যার ঘটনা ৩০% বেড়েছে বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্রমিকদের প্রতিবাদ
এই অবস্থার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আইটি শ্রমিকরা প্রতিবাদে নেমেছেন। তারা দাবি করছেন:
- প্রতিদিন ৮ ঘণ্টার কাজের সময়সীমা কঠোরভাবে মানা হোক।
- চাকরির স্থায়ীত্ব নিশ্চিত করা হোক, যাতে যখন-তখন ছাঁটাইয়ের ভয় না থাকে।
- কর্মস্থলে সামাজিক সুরক্ষা যেমন স্বাস্থ্য বীমা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, এবং নিয়মিত ছুটি চালু করা হোক।
কী করা উচিত?
দীপায়নের মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি জাগরণের ডাক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন:
- কোম্পানিগুলোকে মানবিক নীতি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে কাজের সময়সীমা নির্ধারিত থাকবে।
- সরকারকে শ্রম আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
- সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে কর্মীরা নিজেদের সমস্যা প্রকাশ করতে ভয় না পায়।
দীপায়নের মৃত্যু আমাদের সামনে প্রশ্ন তুলেছে—আমরা কি এভাবেই আমাদের তরুণ প্রজন্মকে হারাতে থাকব? এখনই সময় এসেছে সরকার, কোম্পানি, এবং সমাজের একযোগে এই শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর। দীপায়নের মতো আর কাউকে হারানোর আগে, পরিবর্তন আনতে হবে—এটাই এখন সময়ের দাবি।




