পুরান ঢাকার নওয়াবপুর রোডের সেই চেনা রথখোলায় পা রাখলেই আজও মন কেমন করে ওঠে! সেখানেই যেন মায়াবী এক আলোর রেখা, যা দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে আগলে রেখেছে মিষ্টির এক অবিস্মরণীয় সাম্রাজ্য – আদি মরণচাঁদ ঘোষ এন্ড সন্স। এটি শুধু কোনো মিষ্টির দোকান নয়, এ যেন ঢাকার ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল, যেখানে প্রতিটি মিষ্টির ভাঁজে লুকিয়ে আছে পূর্বপুরুষদের ভালোবাসা আর বাঙালির শত বছরের রসনা বিলাসের গল্প। শুধু পুরান ঢাকা কেন, এই নামটি এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও এক আবেগের প্রতীক।
উনিশ শতকের সেই ধূসর সময়ে, ১৮৫০ থেকে ১৯৬৩ সালের মধ্যে, এক স্বপ্নদ্রষ্টা পুরুষ, গঙ্গাচরণ ঘোষ, এই মিষ্টির কারবারের সূচনা করেছিলেন। তখন প্রতিযোগিতা ছিল তীব্র, কিন্তু তার হাতের জাদুতে তৈরি দইয়ে যখন তিনি প্রথম চিনির ছোঁয়া দিলেন, তা যেন এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে দিল। ঢাকার নওয়াব থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ – সবাই মুগ্ধ হয়েছিলেন সেই অনবদ্য স্বাদে। গঙ্গাচরণ শুধু দই তৈরি করেননি, তিনি তৈরি করেছিলেন এক ভালোবাসার সেতু, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাঙালির হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে।
তারপর এলেন তিন সুযোগ্য পুত্র – বিনোদ বিহারী ঘোষ, কেশব চন্দ্র ঘোষ আর সবচেয়ে ছোট মরণচাঁদ ঘোষ। বাবার ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে মরণচাঁদই যেন মিষ্টির এই জাদুঘরে নতুন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করলেন। বাবার হাতে যেমন ছিল দইয়ের পরশ, মরণচাঁদ নিজের হাতে গড়ে তুললেন নতুন নতুন সব মিষ্টান্নের সম্ভার। তখনকার ছোট্ট ঢাকাতেও তার মিষ্টির সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল বিদ্যুৎ গতিতে। তার প্রতিটি সৃষ্টিতে মিশে ছিল শুধু চিনি আর ছানা নয়, ছিল আন্তরিকতা আর এক অকৃত্রিম মমত্ববোধ।
মরণচাঁদ ঘোষের পর তার তিন পুত্র – সুবোধচন্দ্র ঘোষ, হরিপদ ঘোষ ও শম্ভূনাথ ঘোষ – এই অমূল্য পারিবারিক ঐতিহ্যকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত পরম যত্নে লালন করেন। আর আজ, সেই ভালোবাসার উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে তাদেরই যোগ্য উত্তরসূরিরা। দেশ-বিদেশে তাদের শাখা ছড়িয়ে পড়লেও, সেই নওয়াবপুরের মূল দোকানে আজও যেন প্রথম দিনের মতোই ধোঁয়া ওঠা দুধের ঘ্রাণ আর টাটকা মিষ্টির হাতছানি।
আদি মরণচাঁদ ঘোষ এন্ড সন্স মানে শুধু বিখ্যাত দই নয়। এখানে গেলে আপনার মন ভরে যাবে নানা হারিয়ে যাওয়া মিষ্টির স্বাদে। মাষকালাইয়ের আমিত্তি, বেসনের লাড্ডু, রাজভোগ, রসগোল্লা, কালোজাম, ক্ষীরভোগ, মৌচাক, ল্যাংচা, চমচম, ক্ষীরের চপ – প্রতিটি মিষ্টি যেন আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে ফেলে আসা সোনালি অতীতে। সকাল সাড়ে ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে তাদের মূল শাখা, যেখানে আপনি আজও পাবেন সেই একই খাঁটি স্বাদ, যা শত বছর ধরে অক্ষুণ্ন রয়েছে।
এই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের মূলে রয়েছে শুধু ব্যবসায়িক দক্ষতা নয়, রয়েছে মানুষের রুচি আর চাহিদাকে হৃদয়ে ধারণ করার এক অপূর্ব ক্ষমতা। এটি শুধু ব্যবসার স্থান নয়, এটি এক পারিবারিক আবেগ, এক সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। আদি মরণচাঁদ ঘোষ এন্ড সন্স তাই নিছকই একটি মিষ্টির দোকান নয়; এটি ঢাকার আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, বাঙালির প্রতিটি উৎসবে, প্রতিটি সুখে-দুঃখে এক অবিচল সঙ্গী। দেড়শ বছর পেরিয়েও এই নাম আজও আমাদের মনকে টানে, স্মৃতির পথ ধরে নিয়ে যায় এক মধুর যাত্রায়।


