নয়াদিল্লি, ৩০ মে: মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে প্রচলিত একটি বিরল রৌপ্যমুদ্রা নিয়ে ইতিহাসচর্চায় নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। মুদ্রাটিতে রামায়ণের বনবাস পর্বে রাম ও সীতার চিত্র অঙ্কিত রয়েছে, যা একটি ইসলামি সাম্রাজ্যের সরকারি মুদ্রায় হিন্দু ধর্মীয় প্রতীকের বিরল উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে।
মার্কসবাদী ইতিহাসবিদ ডি. ডি. কোসাম্বি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ An Introduction to the Study of Indian History-এ এই মুদ্রার উল্লেখ করে একে মধ্যযুগীয় ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
প্রচলিত ব্যাখ্যায় এই মুদ্রাকে আকবরের ধর্মীয় সহনশীলতা ও ‘সুলহ-ই-কুল’ নীতির প্রতীক হিসেবে দেখা হলেও, কোসাম্বির বিশ্লেষণ ভিন্ন। তাঁর মতে, এটি কেবল ধর্মীয় সম্প্রীতির নিদর্শন নয়; বরং হিন্দু ও মুসলিম সামন্ত অভিজাতদের মধ্যে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমঝোতার প্রতিফলন।
আকবরের শাসনকালে রাজপুত শাসক ও হিন্দু অভিজাতদের বৃহৎ অংশ মুঘল প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হয়। সাম্রাজ্যের উচ্চপদে হিন্দু আমলাদের নিয়োগ, রাজপরিবারগুলির মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক এবং প্রশাসনিক ক্ষমতায় অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি নতুন শাসকজোট গড়ে ওঠে। কোসাম্বির মতে, এই জোটের ভিত্তি ছিল অভিন্ন সামন্ততান্ত্রিক স্বার্থ।
তিনি যুক্তি দেন, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সামন্তশ্রেণিই কৃষকদের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত সম্পদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে ধর্মীয় পার্থক্য সত্ত্বেও তাদের শ্রেণিগত স্বার্থ ছিল এক। রাম-সীতার চিত্রাঙ্কিত মুদ্রা সেই ঐক্যেরই প্রতীক, যা সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল।
ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, এই মুদ্রা মধ্যযুগীয় ভারতের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের অনন্য নিদর্শন। অন্যদিকে বামপন্থী ইতিহাসচর্চা এটিকে শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক কৌশল ও শ্রেণিগত ঐক্যের দলিল হিসেবে মূল্যায়ন করে।
বর্তমান সময়ে ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যাকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যে আকবরের এই রৌপ্যমুদ্রা আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ইতিহাসবিদদের মতে, এই নিদর্শন দেখায় যে মধ্যযুগীয় ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল বহুস্তরীয় এবং শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে তাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।


