দুর্গাপুর, ৬ আগস্ট - ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক আগস্ট আন্দোলনের সেই ঢেউ, যা সেদিন শ্রমিকদের রক্তে এক নতুন চেতনার সঞ্চার করেছিল, তা আজও সমগ্র সমাজে সমানভাবে বহমান। শোষণের ধরন ও শাসকের আগ্রাসন খুলে দিয়েছিল শ্রমিকের চোখ। সাধারণ দাবি-দাওয়ার আন্দোলন হয়ে উঠেছিল গভীর শ্রেণি সংগ্রামের প্রতীক।
নতুন কর্মী নিয়োগ, ন্যায্য বেতন, ক্যান্টিনের খাবারে পেট ভরে ভাত - এমনই কিছু দাবিতে হিন্দুস্থান স্টীল এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন তৎকালীন ইস্পাত কর্তৃপক্ষের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তা নিতে অস্বীকার করে। উল্টো, ৫ আগস্ট বিকেলে ওল্ড কোর্টের সামনে কয়েক হাজার শ্রমিকের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বিনা প্ররোচনায় নির্মম লাঠিচার্জ শুরু হয়। লাঠির আঘাতে আব্দুল জব্বরের মাথা ফেটে যায় এবং আহত হন শত শত শ্রমিক। সেদিন রাতেই জব্বরের মৃত্যু হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর দেহ বর্ধমানে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই ঘটনার খবর দাবানলের মতো সমগ্র ইস্পাত নগরীতে ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন, ৬ আগস্ট সকালে এ-জোনের হর্ষ-সু মার্কেটের সামনে ওয়ার্কস্ কমিটির নির্বাচিত সদস্য এবং ইউনিয়নের সহ সম্পাদক আশিস দাসগুপ্তকে পুলিশ পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করে।
গর্জে ওঠে সমগ্র দুর্গাপুর। শুরু হয় লাগাতার ধর্মঘট। পুলিশের অত্যাচার মাত্রা ছাড়ালে ইস্পাত নগরীতে মহিলাদের নেতৃত্বে ব্যারিকেডের আন্দোলন শুরু হয়। সমগ্র দুর্গাপুরের বিভিন্ন শিল্পের শ্রমিকেরা এই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ইস্পাত শ্রমিকদের নেতৃত্বে পার্শ্ববর্তী গ্রামাঞ্চলে কৃষক সংগঠন, মহিলা, ছাত্র, যুব, সেক্টর প্রভৃতি সংগঠন গড়ে ওঠে। এটি রাজ্য তথা স্বাধীন ভারতের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সদ্য স্বাধীন দেশের শাসকশ্রেণির মধ্যে তখনো সামন্ততান্ত্রিকতার অবশেষ ছিল। তারা খেটে খাওয়া মানুষকে মানুষ বলেই গণ্য করত না। আবার আধুনিক শিল্পের আধুনিক শ্রমিকের চেতনা ছিল তাদের কাছে আশঙ্কার। তাই শ্রমিকের মধ্যে যে কোনো জাগরণকেই তারা নির্মমভাবে দমন করতে চাইত। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের কাছেও রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের জায়গা নিয়েছে দেশীয় বুর্জোয়ারা। তাই শ্রমিকের যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে হলে গোটা ব্যবস্থাটাকেই বদলানোর প্রয়োজন ছিল।
একবিংশ শতাব্দীর এই কর্পোরেট নিষ্পেষণের যুগেও অবস্থা কি খুব একটা বদলেছে? শোষণের তীব্রতা ও গভীরতা কেবল বেড়েছে। এখন দখল কেবল শ্রমের ফলের ওপর নয়, বরং শ্রমজীবীর মগজে ও চেতনায়। স্বাভাবিকভাবেই এই ঐতিহাসিক আগস্ট আন্দোলনের ঢেউ আজও সমানভাবে বহমান।
প্রতি বছর শ্রদ্ধার সাথে এই দিনটি পালিত হয়। হিন্দুস্থান স্টিল এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের দফতরে মাল্যদানের পাশাপাশি দুর্গাপুরের আশীষ মার্কেটে সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শহীদ দিবস পালিত হয়। এ বছর লহরী সাংস্কৃতিক সংগঠনের সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর শ্রমিক নেতা বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় রক্তপতাকা উত্তোলন করেন এবং বিশিষ্ট গণ আন্দোলনের নেতৃত্ব শহীদ বেদিতে মাল্যদান করেন। প্রাক্তন নেতৃত্বের মধ্যে রথীন রায়, মানস মুখার্জি, সুবীর সেনগুপ্ত, কে কে পাল এবং বর্তমান নেতৃত্ব ললিত মিশ্র, নিবেন্দু সরকার, সীমান্ত চ্যাটার্জি সহ একাধিক নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন। বৃষ্টি উপেক্ষা করে বহু মানুষ এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। বর্তমান সময়ে শ্রমিকদের ওপর নেমে আসা আক্রমণের মোকাবিলা করতে অতীতের এই আন্দোলন এবং শহীদদের স্মরণ করে শ্রমজীবী মানুষের লড়াইকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।











