২৪শে সেপ্টেম্বর – ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের একজন প্রধান সংগঠক ও অদম্য নেতা নানা সাহেব আজ থেকে ১৬৪ বছর আগে, ১৮৫৯ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর, নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে প্রয়াত হন। তাঁর আসল নাম ছিল ধন্দু পন্ত (Dhondu Pant)। ১৮২৪ সালে জন্মগ্রহণকারী নানা সাহেব ছিলেন মারাঠা পেশোয়া দ্বিতীয় বাজি রাওয়ের দত্তক পুত্র। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে 'প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ' নামে পরিচিত ১৮৫৭ সালের মহা-বিদ্রোহে তিনি কানপুর অঞ্চলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
বিদ্রোহের কারণ ও নেতৃত্ব
নানা সাহেবের ব্রিটিশদের প্রতি গভীর অসন্তোষের মূলে ছিল তাঁর পরিবারের পেনশন অধিকার প্রত্যাখ্যান। লর্ড ডালহৌসির 'স্বত্ববিলোপ নীতি' (Doctrine of Lapse) অনুসারে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নানা সাহেবের দত্তক পুত্র হওয়ার কারণে তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি এবং মারাঠা পেশোয়ার পেনশন দাবি অগ্রাহ্য করে। এই অন্যায়ই তাঁকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে উৎসাহিত করে। যখন বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে, নানা সাহেব দ্রুত উত্তর ভারতে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং কানপুরে হাজার হাজার সিপাহী ও সাধারণ মানুষকে একত্রিত করেন। তাঁর ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব এবং কৌশলগত জ্ঞান তাঁকে ব্যাপক সমর্থন এনে দেয়।
কানপুরের ভূমিকা
নানা সাহেব কানপুরে বিদ্রোহের শিখা প্রজ্বলিত করে শহরটি দখল করেন। তাঁর নেতৃত্বে স্বল্প সময়ের জন্য কানপুর ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হয়। তিনি মারাঠা সাম্রাজ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার এবং ঔপনিবেশিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ গ্যারিসনকে অবরোধ করে এবং এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ব্রিটিশ সৈন্যদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। তবে, এই সময় কিছু বিতর্কিত ঘটনা ঘটে, যা ব্রিটিশদের প্রতিশোধমূলক কার্যক্রমের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পলায়ন ও শেষ জীবন
ব্রিটিশরা যখন পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে কানপুর পুনরুদ্ধার করে, নানা সাহেবকে পালিয়ে যেতে হয়। অসংখ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে তিনি নেপালে আশ্রয় নিয়েছিলেন, যেখানে নেপালের প্রধানমন্ত্রী জং বাহাদুর রানা তাঁকে সুরক্ষা দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, নানা সাহেব তাঁর অনুসারীদের নিয়ে নেপালের গভীর জঙ্গলে আত্মগোপন করেন। ১৮৫৯ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর নেপালের পাহাড়ে তাঁর মৃত্যুর খবর আসে। কিছু প্রাথমিক সরকারি নথি এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুসারে, নানা সাহেব সম্ভবত একটি শিকার দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন, তবে তাঁর মৃত্যুর সঠিক পরিস্থিতি আজও সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার নয় এবং ঐতিহাসিকদের মধ্যে তীব্র বিতর্কের বিষয় হয়ে রয়েছে। এই রহস্য তাঁর শেষ জীবনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
উত্তরাধিকার ও স্মরণ
বিদ্রোহের ব্যর্থতার পর নানা সাহেব জনসম্মুখ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেও, প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে ভারতীয় ইতিহাসে তাঁর উত্তরাধিকার অমলিন রয়েছে। তিনি ভারতের স্বাধীনতার জন্য পরবর্তী প্রজন্মের সংগ্রামীদের অনুপ্রাণিত করেছেন। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, নানা সাহেবের অবদান এবং তাঁর দেশপ্রেমিক সত্তাকে ব্যাপকভাবে স্মরণ ও সম্মান জানানো হয়েছে। কানপুরে 'নানা রাও পার্ক' তাঁর নেতৃত্ব এবং স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকারী সকল শহীদের স্মরণে উৎসর্গ করা হয়েছে। এই পার্কটি নানা সাহেবের স্মৃতিকে ধারণ করে চলেছে এবং তাঁর সাহসিকতার গল্প বলে চলেছে।
আজ, ২৪শে সেপ্টেম্বর, কেবল নানা সাহেবের প্রয়াণ দিবস নয়, বরং ভারতের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামকারী প্রজন্মের কাছে তাঁর চিরন্তন অনুপ্রেরণা এবং অদম্য চেতনার স্মারক। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম ভারতের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ যাত্রায় ত্যাগ ও প্রতিরোধের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।