"একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি,হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী।..."
কলকাতা / মেদিনীপুর — যে বয়সে আর পাঁচটা কিশোর মেতে থাকে খেলাধুলায়, চোখে থাকে আগামীর বর্ণিল স্বপ্ন— সেই ১৮ বছর ৮ মাস ৮ দিন বয়সে পরাধীন ভারতের শৃঙ্খল মোচনে অকাতরে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন মেদিনীপুরের বীর সন্তান ক্ষুদিরাম বসু। আজ ১১ আগস্ট, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই মহাত্যাগের দিন। ১৯০৮ সালের এই রক্তঝরা সকালে মুজাফফরপুর জেলা কারাগারের ফাঁসির মঞ্চে অকুতোভয় হাসিমুখে প্রাণ সঁপে দিয়েছিলেন এই চিরকিশোর রক্তসূর্য।
গলায় ফাঁসির দড়ি, হাতে গীতা আর ঠোঁটে একফালি হাসি
১৯০৮ সালের ১১ আগস্টের সেই ঐতিহাসিক ভোর। মুজাফফরপুর জেলের শান্ত বাতাস হঠাৎ থমকে গিয়েছিল এক ১৮ বছরের কিশোরের দৃঢ় পদক্ষেপে। দু'হাতে শক্ত করে চেপে ধরা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, আর চোখেমুখে ভয়ডরহীন এক অলৌকিক জ্যোতি। গলায় ফাঁসির দড়ি পরানোর মুহূর্তেও যার মুখে ছিল মৃদু হাসি।
ব্রিটিশ জজ কর্নডফ থেকে শুরু করে জল্লাদ— সবাই স্তব্ধ হয়ে দেখেছিল, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কোনো মানুষের মুখ এত প্রফুল্ল হতে পারে! বিচারক যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তুমি কি জানো এই রায়ের পরিণতি কী?"— ক্ষুরধার কণ্ঠে ক্ষুদিরাম উত্তর দিয়েছিলেন, "জানি। আর যদি আমাকে কিছুটা সময় দেন, তবে আপনাকেও শিখিয়ে দিতে পারি কীভাবে বোমা তৈরি করতে হয়।"
সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর রক্তাঙ্কিত ইতিহাস
অত্যাচারী ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ড, যে নির্দ্বিধায় ভারতীয় স্বদেশী বিপ্লবীদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালাত— তাকে উচিত শিক্ষা দিতে বুক চিতিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন দুই তরুণ বিপ্লবী: ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী।
- ৩০ এপ্রিলের সেই বিস্ফোরণ: মুজাফফরপুরের ইউরোপিয়ান ক্লাবের সামনে কিংসফোর্ড ভেবে নিক্ষেপ করা হয় বোমা। উদ্দেশ্য সফল হলেও দুর্ভাগ্যের বিষয় গাড়িতে ছিলেন না কিংসফোর্ড, প্রাণ হারান দুই ইংরেজ মহিলা।
- ধরা পড়ার সেই মুহূর্ত: ঘটনার পর টানা ২৫ মাইল খালি পায়ে হেঁটে, ধুলোবালি মাখা শরীরে পিপাসার্ত ক্ষুদিরাম ওয়াইনি স্টেশনে পৌঁছান। সেখানে পুলিশের সন্দেহ হলে তিনি ধরা পড়েন, কিন্তু বিন্দুমাত্র অনুশোচনা প্রকাশ করেননি।
- প্রফুল্ল চাকীর আত্মাহুতি: অন্যদিকে সহযোদ্ধা প্রফুল্ল চাকী ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা দেওয়ার আগেই নিজের পিস্তলের গুলিতে আত্মাহুতি দিয়ে শহিদের মর্যাদা বরণ করেন।
এক শহিদের রক্তে জেগে উঠেছিল পুরো ভারতবর্ষ
ক্ষুদিরামের সেই বীরত্বপূর্ণ আত্মবলিদান কেবল একটি জীবনের পরিসমাপ্তি ছিল না; তা ছিল পরাধীন ভারতের কোটি কোটি ঘুমন্ত আত্মাকে জাগিয়ে তোলার এক প্রচণ্ড বজ্রপাত। তাঁর এই রক্ত বিসর্জন বাংলার ঘরে ঘরে জন্ম দিয়েছিল হাজারো বিপ্লবীর। মায়েদের চোখে কান্না ছিল, কিন্তু সেই কান্নার আড়ালে জন্ম নিয়েছিল গর্ব— নিজের সন্তানকে দেশের বল বেদীতে উৎসর্গ করার গর্ব।
আজও যখন মেদিনীপুরের মাটি ছুঁয়ে বাতাস বহে যায়, কিংবা গঙ্গার বুক চিরে ভেসে আসে সেই চেনা লোকগাঁথা— মনে হয়, বীর ক্ষুদিরাম মরে যাননি। পরাধীনতার অন্ধকার চিরে জন্ম নেওয়া প্রতিটি মুক্ত বাতাসে, স্বাধীন ভারতের প্রতিটি স্পন্দনে আজও বেঁচে আছেন আমাদের চিরকিশোর অগ্নিপুরুষ ক্ষুদিরাম বসু।
বীর শহিদ ক্ষুদিরাম বসু অমর থাকুন! বন্দে মাতরম্!


