নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুর: শীতের আমেজ মাখা বিকেলে দুর্গাপুরের এএসপি (ASP) স্টেডিয়াম চত্বর সাক্ষী থাকল এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের ৪০তম প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে ‘দুর্গাপুর ইস্পাত বিজ্ঞান কেন্দ্র’-এর উদ্যোগে আয়োজিত বিজ্ঞান মেলা ও উৎসবটি কেবল একটি প্রথাগত অনুষ্ঠান ছিল না, বরং এটি হয়ে উঠেছিল বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ, কৃতি পড়ুয়া এবং সমাজসেবীদের এক মহামিলনমেলা। বিজ্ঞান যে শুধু ল্যাবরেটরিতে আবদ্ধ নয়, বরং তা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং মানবিকতার বিকাশে অপরিহার্য—সেটাই ছিল এই অনুষ্ঠানের মূল সুর।
পতাকা উত্তোলনে অনুষ্ঠানের সূচনা
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়ে। সংগঠনের সভানেত্রী শ্রীমতি অরুন্ধতী ভাদুড়ী যখন সংগঠনের পতাকা উত্তোলন করেন, তখন উপস্থিত সকলের চোখেমুখে ছিল গর্ব ও শ্রদ্ধার ছাপ। দীর্ঘ চার দশকের বিজ্ঞান আন্দোলনের এই পথচলার আবেগে তাঁর চোখ সিক্ত হলেও, কণ্ঠে ছিল কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়।
প্রতিভার স্বীকৃতি ও কৃতি ছাত্রছাত্রীদের সংবর্ধনা
এদিনের অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘সায়েন্স ট্যালেন্ট সার্চ’ (STSE)-এ সফল মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের পুরস্কৃত করা। মেধা তালিকায় স্থান পাওয়া কৃতিদের হাতে যখন পুরস্কার ও শংসাপত্র তুলে দেওয়া হচ্ছিল, তখন গোটা স্টেডিয়াম করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। আগামীর বিজ্ঞান সাধকদের এই স্বীকৃতি প্রদান অনুষ্ঠানে এক অন্য মাত্রা যোগ করে। অভিভাবকদের গর্বিত মুখ এবং পড়ুয়াদের উজ্জ্বল উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বিজ্ঞান চর্চায় নতুন প্রজন্ম পিছিয়ে নেই।
বিদ্যালয় পড়ুয়াদের বিজ্ঞান প্রদর্শনী
দুর্গাপুরের বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা এই মেলায় তাদের তৈরি বিজ্ঞান মডেল প্রদর্শন করে। খুদে বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা ও বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে সহজ মডেলের মাধ্যমে উপস্থাপনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। পরিবেশ রক্ষা থেকে শুরু করে প্রযুক্তির ব্যবহার—শিক্ষার্থীদের তৈরি প্রতিটি মডেলে ছিল আগামীর সম্ভাবনার ছাপ।
বিশেষজ্ঞের আলোচনা ও প্রেজেন্টেশন
অনুষ্ঠানে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে উপস্থিত ছিলেন এনআইটি (NIT) কলেজের বিশিষ্ট অধ্যাপক হিরক স্যার। তাঁর মনোজ্ঞ প্রেজেন্টেশন এবং বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। তিনি যেভাবে বিজ্ঞানের জটিল সূত্রগুলোকে সমাজের অগ্রগতির সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করেন, তা উপস্থিত ছাত্রছাত্রী ও দর্শকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার করে।
মানবিকতার স্পর্শ ও সচেতনতা
তবে অনুষ্ঠানের আবেগের পারদ চড়ে যখন থ্যালাসেমিয়া সেন্টারের পক্ষ থেকে বিশিষ্ট সমাজকর্মী শ্রী গোপী রঞ্জন বসু বক্তব্য রাখতে ওঠেন। সমাজ থেকে থ্যালাসেমিয়া নির্মূল এবং রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁর প্রতিটি কথা শ্রোতাদের হৃদয় স্পর্শ করে। বিজ্ঞান যে কেবল যান্ত্রিকতা নয়, বরং তা মানুষের জীবন বাঁচানোর হাতিয়ার—তাঁর বক্তব্যে সেই বার্তাটিই জোরালো হয়ে ওঠে।
জেলা নেতৃত্বের উপস্থিতি
এই মহৎ উদ্যোগকে সফল করতে এবং কর্মীদের উৎসাহ দিতে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের একাধিক জেলা নেতৃত্ব। তাঁদের উপস্থিতি স্থানীয় কর্মীদের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ রূপটি সকলের সামনে ফুটে ওঠে।
সব মিলিয়ে, বিজ্ঞান মঞ্চের এই উদ্যোগ দুর্গাপুরবাসীকে উপহার দিল এক স্মরণীয় সন্ধ্যা, যেখানে যুক্তি, বিজ্ঞান, মেধার স্বীকৃতি এবং মানবিক আবেগ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। আয়োজকদের আশা, এই অনুষ্ঠানের রেশ ধরেই আগামী দিনে কুসংস্কারমুক্ত ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ার আন্দোলন আরও জোরদার হবে।