নিজস্ব প্রতিনিধি, বিশাখাপত্তনম: আজ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমে এক উৎসবমুখর ও বৈপ্লবিক পরিবেশে শুরু হলো সেন্টার অফ ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস (CITU)-এর ১৮তম সর্বভারতীয় মহাসম্মেলন। বিশাখাপত্তনমের সৈকত সংলগ্ন অন্ধ্র ইউনিভার্সিটি কনভেনশন সেন্টারে এই সম্মেলন আয়োজিত হচ্ছে, যা আগামী ৪ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত চলবে। দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান শ্রমিক অসন্তোষ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম আইনের আমূল পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই সম্মেলনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আন্দোলনের মূল সুর: শ্রম কোড ও বেসরকারিকরণ বিরোধী লড়াই
সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশন থেকেই সিআইটিইউ নেতৃবৃন্দ কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁদের অভিযোগ, ২৯টি শ্রম আইনকে বাতিল করে যে চারটি নতুন 'শ্রম কোড' (Labour Codes) আনা হয়েছে, তা শ্রমিকদের দাসত্বে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর। সম্মেলনে বক্তারা বলেন:
কর্পোরেট তোষণ: বর্তমান সরকার দেশের সম্পদ মুষ্টিমেয় কর্পোরেটদের হাতে তুলে দিচ্ছে।
অধিকার হরণ: ১২ ঘণ্টার কাজের সময়সীমা এবং ধর্মঘটের অধিকার খর্ব করার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
সরকারি ক্ষেত্র রক্ষা: রেল, প্রতিরক্ষা, কয়লা এবং ব্যাংকিং ক্ষেত্রের বেসরকারিকরণ রুখতে অল ইন্ডিয়া কনফারেন্স থেকে দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে।
শ্রমিক উৎসব: সংস্কৃতির আঙিনায় প্রতিবাদের ভাষা
সম্মেলনের মূল অধিবেশনের পাশাপাশি গত ২৭ ডিসেম্বর থেকেই শুরু হয়েছে ‘শ্রমিক উৎসব’। বিশাখাপত্তনমের বিচ রোডে আয়োজিত এই উৎসবে শ্রমিকদের জীবনসংগ্রামকে গান, নাটক এবং লোকশিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে।
বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ: প্রখ্যাত অভিনেতা প্রকাশ রাজ, অভিনেত্রী রোহিণী, গণসঙ্গীত শিল্পী সুদ্দালা অশোক তেজা এবং গোরতি ভেঙ্কান্নার মতো ব্যক্তিত্বরা এই উৎসবে শামিল হয়েছেন। প্রকাশ রাজ তাঁর বক্তব্যে বলেন, "শ্রমিকরাই সমাজের মেরুদণ্ড, তাঁদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।"
প্রদর্শনী: সম্মেলনে বিজ্ঞান ও সাহিত্য বিষয়ক বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে ভারতের শ্রমিক আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস প্রদর্শিত হচ্ছে।
প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ও সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধি
গোটা ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্য থেকে প্রায় ১,৩০০ জন নির্বাচিত প্রতিনিধি এই সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। সম্মেলনটি কেবল শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এতে বিপুল সংখ্যায় অংশ নিয়েছেন:
স্কিম ওয়ার্কার: অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, আশা (ASHA) কর্মী এবং মিড-ডে মিল কর্মীরা, যাঁরা ন্যূনতম মজুরি ও স্বীকৃতির দাবিতে লড়ছেন।
অসংগঠিত ক্ষেত্র: নির্মাণ শ্রমিক থেকে শুরু করে গিগ ইকোনমি বা ডেলিভারি বয়দের ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা তাঁদের সমস্যার কথা তুলে ধরছেন।
সিআইটিইউ-এর ঐতিহাসিক ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সিআইটিইউ ভারতের ট্রেড ইউনিয়ন ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য নাম। ১৯৭৪ সালের ঐতিহাসিক রেল ধর্মঘট থেকে শুরু করে ২০১৯ সালে ২০ কোটি শ্রমিকের অংশগ্রহণে হওয়া সাধারণ ধর্মঘট—প্রতিটি পদক্ষেপে সিআইটিইউ তার লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে।
এবারের সম্মেলনের বিশেষ দিক হলো মহিলা শ্রমিকদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ। বর্তমানে সিআইটিইউ-এর মোট সদস্যপদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মহিলা, যা ভারতীয় শ্রম আন্দোলনে এক বড় পরিবর্তন। আগামী পাঁচ দিনের রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে প্রতিনিধিরা নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জানাবেন এবং আগামীর জন্য একটি শক্তিশালী 'অ্যাকশন প্ল্যান' তৈরি করবেন।
আগামী ৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে একটি বিশাল প্রকাশ্য সমাবেশের মাধ্যমে এই সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটবে। ধারণা করা হচ্ছে, বিশাখাপত্তনমের রাজপথ সেদিন লক্ষাধিক শ্রমিকের পদভারে প্রকম্পিত হবে। এই মহাসম্মেলন থেকে শুধু অর্থনৈতিক দাবিদাওয়াই নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার বার্তাও দেওয়া হচ্ছে।


