সাম্প্রতিক তথাকথিত 'জেন-জি' বিক্ষোভের পর নেপালের কমিউনিস্ট প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির ক্ষমতাচ্যুতির ঘটনায় অনেকেই নেপালি কমিউনিস্ট পার্টির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। বিশেষ করে, ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের মধ্যে এ নিয়ে উল্লাস ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানেই নেপালের রাজনীতিতে দুর্দান্তভাবে প্রত্যাবর্তন করেছে কমিউনিস্টরা।
একসময় প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে সেনাবাহিনীর আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হওয়া কেপি শর্মা ওলি আবার ফিরে এসেছেন জনগণের মাঝে। তার দল, কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল (ইউএমএল), দেশজুড়ে বড় বড় জনসভা করছে এবং তাতে হাজার হাজার মানুষ অংশ নিচ্ছেন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা শুনতে উপচে পড়ছে ভিড়।
নেপালের আরেক গুরুত্বপূর্ণ কমিউনিস্ট নেতা হলেন পুষ্পকুমার দহল, যিনি প্রচণ্ড নামে পরিচিত। তিনি নেপালের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির কিংবদন্তিতুল্য নেতা। তার নেতৃত্বেই সংগ্রামের মাধ্যমে নেপালের কমিউনিস্টরা রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়েছিল। 'জেন-জি' বিক্ষোভের আঁচ প্রচণ্ডর দলেও লেগেছিল, কিন্তু তিনিও দারুণভাবে প্রত্যাবর্তন করেছেন।
তাঁর দল, মাওবাদী কেন্দ্র, ছোট-বড় বেশ কয়েকটি কমিউনিস্ট দলের সঙ্গে একজোট হয়ে নতুন দল 'নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি' গঠন করেছে। এই দলগুলির মধ্যে অন্যতম প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মাধব নেপালের দল, কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল (ইউনিফায়েড সোশ্যালিস্ট)। এই ঐক্যবদ্ধ নতুন কমিউনিস্ট দল এখন দেশজুড়ে সভা-সমাবেশ করছে এবং তাতে প্রচুর মানুষের সমাগম হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মও দলে দলে এই নতুন দলের পতাকাতলে সামিল হচ্ছে। প্রচণ্ড নিজেও তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে নেপালের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। হিমালয়ের কোলের এই সুন্দর দেশটিতে লাল পতাকার শক্তি বিপুল। কমিউনিস্টরা অতীতের ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে নতুন শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে এবং জনগণের ব্যাপক সমর্থনও পাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দুটি দেশ, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের বিক্ষোভে সরকার উৎখাত হলেও নেপালের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। নেপালের গণতন্ত্র অপেক্ষাকৃত নতুন। ২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে নেপাল আত্মপ্রকাশ করে।
ভারতের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নেপালেও গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ ঘটে। রানা সাম্রাজ্যের অধীনস্থ নেপালে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা তীব্র হতে থাকে। ১৯৪৭ সালে নেপালি কংগ্রেস এবং ১৯৪৯ সালে নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দুটি দল রানাদের বিরুদ্ধে যৌথ আন্দোলন শুরু করে। ১৯৫১ সালের দিল্লি সমঝোতার মাধ্যমে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের অধীনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। কিন্তু ১৯৬০ সালের ডিসেম্বরে রাজা মহেন্দ্র নির্বাচিত সংসদ ভেঙে দিয়ে সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেন।
এই স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে পরবর্তী তিন দশকের আন্দোলনে কমিউনিস্টরা অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করে। ১৯৯০ সালে নেপালি কংগ্রেস এবং কমিউনিস্টদের যৌথ উদ্যোগে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবিতে বিরাট গণআন্দোলন সংগঠিত হয়। এই আন্দোলনের চাপে তৎকালীন রাজা বীরেন্দ্র বহুদলীয় গণতন্ত্রের দাবি মেনে নেন।
ইতিমধ্যে, পুষ্পকুমার দহলের (প্রচণ্ড) নেতৃত্বে মাওবাদী পার্টি রাজতন্ত্র, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার কাঠামোয় উচ্চবর্ণের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাদের গেরিলা বাহিনী, যা পরে 'পিপলস লিবারেশন আর্মি' নামে পরিচিতি পায়, ১৯৯৬ সাল থেকে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। এই সংগ্রামে হাজার হাজার কমিউনিস্ট বিপ্লবী শহীদ হন।
২০০১ সালের ১লা জুন রাজপ্রাসাদের এক মর্মান্তিক ঘটনায় রাজা বীরেন্দ্রসহ রাজপরিবারের নয়জন সদস্য নিহত হন। এরপর রাজা হন জ্ঞানেন্দ্র। তার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ২০০৬ সালে প্রচণ্ডর নেতৃত্বাধীন মাওবাদীদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নেপালি কংগ্রেস এবং সিপিএন (ইউএমএল) রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলন জোরদার করে। এই দ্বিতীয় গণআন্দোলনের ফলে নেপালে রাজতন্ত্রের অবসান হয় এবং ২০০৮ সালের মে মাসে নেপাল একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ঘোষিত হয়।
২০০৮ সালের সংসদীয় নির্বাচনে মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি সর্বাধিক ভোট পেলেও একক সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে মাওবাদীদের নেতৃত্বে জোট সরকার গঠিত হয়। কিন্তু ক্ষমতার লোভ এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে এই সরকার স্থিতিশীল হয়নি। এর পর থেকে নেপালের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা চলতে থাকে। নেতারা জনগণের স্বপ্ন পূরণের পরিবর্তে দুর্নীতি ও স্বজনপোষণে লিপ্ত হন, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক হতাশার জন্ম দেয়। এরই প্রতিক্রিয়ায় ২০২৫ সালে 'জেন-জি' বিদ্রোহ ফেটে পড়ে।
এই বিক্ষোভ নেপালের কমিউনিস্টদের তাদের ভুল-ত্রুটি উপলব্ধি করতে এবং নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য করেছে। তারা এখন জনগণের কাছে ফিরে গিয়ে তাদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে। নেপালের কমিউনিস্টদের সামনের পথটি কঠিন হলেও, জনগণের ভালোবাসা এবং সমর্থনকে পাথেয় করে তারা আবারও ইতিহাস রচনা করতে পারে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।