নিজস্ব প্রতিনিধি, দুর্গাপুর, ১০ জানুয়ারি ২০২৬:
শীতের বিকেলে দুর্গাপুরের সিটি সেন্টারের সৃজনী প্রেক্ষাগৃহ তখন কানায় কানায় পূর্ণ। উপলক্ষ—ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (BEFI)-র ষোড়শ রাজ্য সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশ। কিন্তু এই সমাবেশ নিছক কোনো প্রথাগত মিটিং ছিল না, বরং তা হয়ে উঠল বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদের মঞ্চ। প্রধান বক্তা তথা সিটু (CITU)-র রাজ্য সম্পাদক কমরেড জিয়াউল আলম যখন মাইক হাতে নিলেন, তখন তাঁর প্রতিটি শব্দে ঝরে পড়ল ক্ষোভ, অভিমান এবং এক চরম হুঁশিয়ারি।
কর্পোরেট ‘দক্ষতা’ নাকি আধুনিক দাসত্ব?
ম্যানেজমেন্টের তথাকথিত 'এফিসিয়েন্সি' বা দক্ষতার মুখোশ খুলে দিয়ে জিয়াউল আলম বলেন, "আজকের দিনে দক্ষতার সংজ্ঞা বদলে গেছে। ১০ জনের কাজ ২ জনকে দিয়ে করিয়ে নেওয়াটাকেই এরা বলছে 'কস্ট টু কোম্পানি' কমানো। কিন্তু একে দক্ষতা বলে না, একে বলে আধুনিক শ্রম শোষণ।" তাঁর এই বক্তব্যে উপস্থিত ব্যাঙ্ক কর্মীদের করতালিতে ফেটে পড়ে প্রেক্ষাগৃহ, যেন প্রতিটি কর্মী নিজেদের প্রতিদিনের যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি শুনতে পেলেন নেতার গলায়।
করোনা কালের সেই ভুলে যাওয়া ত্যাগের কথা
বক্তব্যের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তে জিয়াউল আলম মনে করিয়ে দেন সেই ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতির কথা। তিনি বলেন, "সেদিন যখন প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বড় বড় আমলারা এসি ঘরের নিরাপদ আশ্রয়ে বন্দি, তখন এই ব্যাঙ্ক কর্মীরাই জীবনের বাজি রেখে রাস্তায় নেমেছিলেন। সারা দেশকে সচল রাখতে, মানুষকে টাকা পৌঁছে দিতে গিয়ে কত সহকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন, তার হিসাব কেউ রাখেনি। আজ সেই ত্যাগের কি এই প্রতিদান? আজ আমাদেরই চাকরি নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে?"
ঐতিহ্যের ভারত ও বর্তমানের সংকট
কেবল ব্যাঙ্কিং সেক্টর নয়, দেশের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটও উঠে আসে তাঁর ভাষণে। আল-বিরুনি থেকে মার্কোপোলোর দেখা ভারতবর্ষের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, "ভারতবর্ষ মানেই মহামিলনের ক্ষেত্র। কিন্তু আজ এক অশুভ শক্তি আমাদের সেই ঐক্যের বুনন ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে। একদিকে ডলারের সাপেক্ষে টাকার দাম কমছে, সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, আর অন্যদিকে কর্পোরেটদের স্বার্থে ব্যাঙ্কের নীতি নির্ধারণ করা হচ্ছে।"
লড়াইয়ের ডাক
গ্রামের প্রান্তিক মানুষ থেকে শহরের সাধারণ নাগরিক—সকলের জমানো টাকার নিরাপত্তা আজ প্রশ্নের মুখে। এই আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, "ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণ রুখতে এবং কর্মীদের অধিকার রক্ষা করতে আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।"
সৃজনী হল প্রাঙ্গণ থেকে একজোটে আওয়াজ ওঠে—এই লড়াই বাঁচার লড়াই। বেফি-র পশ্চিমবঙ্গ শাখার এই সম্মেলনে জিয়াউল আলমের আগুনঝরা বক্তব্য কর্মীদের মনে এক নতুন উদ্দীপনা ও সংকল্পের জন্ম দিল।






