যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ইনভেশন প্ল্যান’ বা আক্রমণের পরিকল্পনা তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল (Daily Mail)-এর এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে এই দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প মার্কিন স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডারদের গ্রিনল্যান্ডে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের ব্লুপ্রিন্ট প্রস্তুত রাখতে বলেছেন।
এই খবর প্রকাশ্যে আসার পর নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (NATO) বা ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ এবং ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেদনের বিস্তারিত ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
ডেইলি মেইলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসের অন্দরমহলে এই পরিকল্পনা নিয়ে তীব্র মতভেদ চলছে:
১. স্টিফেন মিলারের আগ্রাসী অবস্থান: ট্রাম্পের অন্যতম শীর্ষ নীতি উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার (Stephen Miller) এই সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন।
২. পেন্টাগনের উদ্বেগ: অন্যদিকে, পেন্টাগন এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর বরিষ্ঠ কর্মকর্তারা এই নির্দেশে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তারা মনে করছেন, ন্যাটো-র মিত্র দেশ ডেনমার্কের ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান চালালে তা হবে নজিরবিহীন এবং আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এর ফলে ৭০ বছরের পুরনো ন্যাটো সামরিক জোট ভেঙে পড়তে পারে এবং রাশিয়ার মতো শত্রু দেশগুলো এর ফায়দা লুটতে পারে।
নির্বাচনের আগে বড় কোনো পদক্ষেপ?
ইউরোপীয় কূটনীতিকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ২০২৬ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের (Midterm Elections) আগেই ট্রাম্প এই অভিযান চালানোর চেষ্টা করতে পারেন। বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা সৃষ্টি এবং নিজের শক্তি প্রদর্শনের জন্য নির্বাচনের ঠিক আগে তিনি এমন একটি ‘সারপ্রাইজ’ বা চমক দিতে পারেন। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের পর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের এই পরিকল্পনাকে আর নিছক ফাঁকা বুলি হিসেবে দেখছে না বিশ্ব।
গ্রিনল্যান্ড কেন ট্রাম্পের লক্ষ্য?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড প্রীতির কারণ মূলত তিনটি:
প্রাকৃতিক সম্পদ: গ্রিনল্যান্ডের মাটির নিচে রয়েছে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ সম্পদ (Rare Earth Minerals), যা আধুনিক প্রযুক্তি এবং অস্ত্র তৈরিতে অপরিহার্য।
4 বর্তমানে এই খনিজ সরবরাহে চীনের একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে, যা ট্রাম্প ভাঙতে চান।কৌশলগত অবস্থান: আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতে গ্রিনল্যান্ডকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র।
রাজনৈতিক বার্তা: ট্রাম্প মনে করেন, বিশাল এই দ্বীপটি কিনে নেওয়া বা দখলে নেওয়া তার প্রেসিডেন্সির একটি ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে গণ্য হবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: ন্যাটোর অস্তিত্ব সংকট?
ডেনমার্ক সরকার ট্রাম্পের এই মনোভাবের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়। তবে এবারের ‘সামরিক অভিযানের’ খবর ডেনমার্ককে আরও কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য করেছে। কোপেনহেগেন হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, মিত্র দেশের ওপর এমন হামলা হলে তা হবে ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর লঙ্ঘন, যার অর্থ হলো—ন্যাটো জোটের সমাপ্তি।
ইউরোপের অন্যান্য নেতারাও ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তারা বলছেন, একবিংশ শতাব্দীতে এসে মিত্র দেশের ভূখণ্ড দখলের পরিকল্পনা ঔপনিবেশিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।


