নিজস্ব প্রতিবেদন: মানচিত্রের কাটাকুটি আর রাজনীতির দাবার চালে যখন এক টুকরো ভূমিকে পণ্য বানানোর চেষ্টা করা হয়, তখন জন্ম নেয় এক পরাধীনতার গভীর ক্ষত। আটলান্টিক মহাসাগরের হিমশীতল হাওয়ায় আজ মিশে আছে সেই কান্নার সুর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের জেদ এখন আর শুধু সংবাদপত্রের শিরোনাম নয়, বরং এটি ইউরোপের কয়েক কোটি মানুষের আত্মসম্মানে এক বিশাল আঘাত।
“আমরা পণ্য নই, আমরা মানুষ”
“গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়”—এই স্লোগান এখন আর কেবল শ্লোগান নেই, এটি নুক (Nuuk) থেকে কোপেনহেগেনের তুষারপাত ভেজা রাস্তায় এক প্রতিবাদের ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউরোপের মানচিত্রে কালো ছায়া
দীর্ঘ কয়েক দশকের মিত্রতা আজ ধূলিসাৎ হতে বসেছে। ট্রাম্প যখন ইউরোপীয় দেশগুলোকে শুল্কের হুমকি দিয়ে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করছেন, তখন ইউরোপের নেতারা বিষণ্ণ মনে ভাবছেন সেই ফেলে আসা দিনগুলোর কথা, যখন আমেরিকা ছিল তাদের পরম বন্ধু। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে ফরাসি প্রেসিডেন্ট—সবার কণ্ঠেই আজ একরাশ হতাশা আর ক্ষোভ। তারা বলছেন, ন্যাটোর মতো পবিত্র বন্ধনকে আজ ক্ষমতার লোভে ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। এটি কেবল বাণিজ্যিক ‘ডিভোর্স’ নয়, এটি একটি দীর্ঘ সম্পর্কের করুণ মৃত্যু।
আদিবাসী হৃদয়ের রক্তক্ষরণ
গ্রিনল্যান্ডের ইনুইট (Inuit) সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে ভূমি কেবল মাটি নয়, এটি তাদের অস্তিত্ব। নাজা রোসিং নামের এক নারী অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, “আমেরিকা আগেও আদিবাসীদের জমি চুরি করেছে। তারা মনে করে সবকিছুই কেনা যায়। কিন্তু মানুষকে কেনা যায় না, আমাদের ইতিহাস কেনা যায় না। দয়া করে আমাদের একা থাকতে দিন।”
শেষ লড়াইয়ের প্রস্তুতি
ইউরোপ আজ এক কঠিন সন্ধিক্ষণে। একদিকে আমেরিকার মতো শক্তিশালী বন্ধুর বিমুখ হওয়া, অন্যদিকে নিজের মাতৃভূমি ও সম্মান রক্ষার দায়। ডেনমার্ক ও তার মিত্ররা গ্রিনল্যান্ডের বরফে সেনা পাঠাতে শুরু করেছে—এই সেনা পাঠানো যুদ্ধের জন্য নয়, বরং এই বার্তা দিতে যে, “আমরা হারতে রাজি নই।”
এক অনিশ্চিত আগামী
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে পৃথিবী কি আবার সেই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সাক্ষী হতে চলেছে? গ্রিনল্যান্ডের শিশুদের চোখে আজ ভয়, তাদের মায়েরা কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছেন—আগামীকাল কি তাদের পতাকা বদলে যাবে? ডোনাল্ড ট্রাম্পের একগুঁয়েমি হয়তো মানচিত্র বদলাতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছে, তা মুছবে কোন ইতিহাস?
ইউরোপ আজ প্রস্তুত, তবে আনন্দের সঙ্গে নয়, বরং বুকভরা অভিমান আর একরাশ ঘৃণা নিয়ে আমেরিকার হাত ছাড়তে। এই ‘ডিভোর্স’ কোনো জয় নয়, এটি বিশ্ব রাজনীতির এক চরম ট্র্যাজেডি।


