আন্তর্জাতিক ডেস্ক তারিখ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
ইরানের রাজপথে চলমান তীব্র বিক্ষোভ এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে। সরবরাহকৃত দৃশ্যমান তথ্য এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের নেপথ্যে তিনটি প্রধান দিক উন্মোচিত হয়: গোয়েন্দা তৎপরতা, বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলগত জ্বালানি নিরাপত্তা।
১. গোয়েন্দা তৎপরতা ও ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন বিতর্ক
তেহরানের সাম্প্রতিক অস্থিরতায় ধর্মীয় উপাসনালয় ও মসজিদে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগের তীর: প্রচার হওয়া তথ্যানুসারে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের দীর্ঘদিনের মূলমন্ত্র "By way of deception, thou shalt do war" (প্রতারণার মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনা) এখানে কার্যকর হতে পারে। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ দাবি করছে, সরকারবিরোধী আন্দোলনকে বিতর্কিত করতে এবং সাধারণ জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে আন্দোলন দমনের পথ প্রশস্ত করতে পরিকল্পিতভাবে এসব নাশকতামূলক কাজ করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় ভাষ্য: বিপরীতক্রমে, তেহরান প্রশাসন দাবি করছে যে, সিআইএ ও মোসাদ সমর্থিত এজেন্টরা সরাসরি দাঙ্গা উসকে দিচ্ছে।
২. কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও ‘রথচাইল্ড’ তত্ত্বে অনুসন্ধান
ইরান সংকটের একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং বিতর্কিত দিক হলো দেশটির আর্থিক স্বাধীনতা। বিশ্বজুড়ে প্রচলিত একটি তত্ত্ব মতে, ইরান বিশ্বের সেই হাতেগোনা দেশগুলোর একটি যারা তথাকথিত 'রথচাইল্ড-নিয়ন্ত্রিত' বৈশ্বিক ব্যাংকিং আধিপত্যের বাইরে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ২০০০ সালের পর থেকে ইরাক, লিবিয়া এবং সিরিয়ার মতো দেশগুলো যারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত ছিল, তারা ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধ ও অভ্যুত্থানের সম্মুখীন হয়েছে।
অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য: বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন খর্ব করা এবং আন্তর্জাতিক ঋণ (IMF) ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করাই হতে পারে এই ‘ইকোনমিক রিস্ট্রাকচারিং’ বা অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য। এর ফলে কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সরাসরি আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৩. কৌশলগত অবস্থান: হরমুজ প্রণালী ও জ্বালানি রাজনীতি
মানচিত্র অনুযায়ী ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।
এনার্জি চোকপয়েন্ট: বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০% বাহিত হয় ‘স্ট্রেট অফ হরমোজ’ বা হরমুজ প্রণালী দিয়ে। এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকা মানেই হলো বিশ্ব জ্বালানি বাজারের চাবিকাঠি তাদের কাছে থাকা।
ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ: এই অঞ্চলে যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করবে। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও পানিপথ পুরোপুরি পশ্চিমা প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসার একটি কৌশল হতে পারে।
৪. তথ্য যুদ্ধ (Information Warfare) ও ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা
সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত কিছু স্ক্রিনশটে দাবি করা হচ্ছে যে, নেট রথচাইল্ড সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাধ্যমে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছেন। যদিও এসকল তথ্যের ডিজিটাল ফরেনসিক যাচাইকরণ অত্যন্ত জরুরি, তবে এটি পরিষ্কার যে এই সংকটটি কেবল রাজপথে নয়, বরং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও সমানভাবে পরিচালিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দ্বারা তৈরি ছবি এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য (Misinformation) জনমত গঠনে বড় ভূমিকা পালন করছে।
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি আদর্শিক লড়াই নয়, বরং এটি সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো নির্ধারণের একটি বৃহৎ যুদ্ধের অংশ হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এই সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতি কি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সংস্কার, নাকি ইরাক ও লিবিয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি?


