নিজস্ব প্রতিবেদন, ফরাক্কা | ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬
ভোটের আগে অধিকার রক্ষায় মানুষ যখন সরকারি অফিসের দরজায় কড়া নাড়ছেন, তখন সেখানে মিলছে শুধুই ধমক আর ভাঙচুরের ছবি। ফরাক্কার তৃণমূল বিধায়ক মনিরুল ইসলামের সাম্প্রতিক 'মাস্তানি' এবং খোদ নির্বাচন কমিশনকে কুরুচিকর আক্রমণ যেন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অবক্ষয়ের এক চূড়ান্ত নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই দাপটের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে কয়েক হাজার সাধারণ মানুষের চোখের জল আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
সরকারি অফিসে তাণ্ডব: বিপন্ন সাধারণের নথি
গত ১৪ জানুয়ারি ফরাক্কা বিডিও অফিসে যা ঘটেছে, তাকে কোনোভাবেই 'গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ' বলা চলে না। ভোটার তালিকা সংশোধনের (SIR) কাজে যখন হাজার হাজার মানুষ নিজেদের নাগরিকত্ব এবং ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে নথিপত্র জমা দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বিধায়কের নেতৃত্বে একদল বাহিনী সেখানে তাণ্ডব চালায়। ছিঁড়ে ফেলা হয় সাধারণ মানুষের জমা দেওয়া ফর্ম, উল্টে দেওয়া হয় চেয়ার-টেবিল।
প্রশ্ন উঠছে— যারা দিনমজুরি ফেলে নথিপত্র ঠিক করতে এসেছিলেন, সেই গরিব মানুষগুলোর হারানো ফর্ম কি বিধায়ক পূরণ করে দেবেন? নাকি দাপট দেখাতে গিয়ে সাধারণের অধিকারটাই ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন তিনি?
"মাটির তলা থেকে টেনে বের করব"— এ কি জনপ্রতিনিধির ভাষা?
একজন বিধায়ক যখন প্রকাশ্য জনসভায় দেশের সংবিধান মেনে চলা নির্বাচন কমিশনকে "মাটির তলা থেকে টেনে বের করে আনা" বা "কোমর ভেঙে দেওয়ার" হুমকি দেন, তখন বুঝতে হবে আইনের শাসন কতটা বিপন্ন। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকায় নাম থাকা মৃত বা ভুয়া ভোটারদের বাদ দিতেই কি এই ভয় দেখানো? কেন মনিরুল ইসলাম চান না কমিশন স্বচ্ছভাবে কাজ করুক?
মুর্শিদাবাদের সচেতন নাগরিকদের মতে, এই হুমকি আসলে কমিশনকে নয়, বরং সেই সব ভোটারদের যারা বিধায়কের মতাদর্শের সঙ্গে একমত নন।
দিল্লি থেকে নির্দেশের পাহাড় এলেও ফরাক্কার পুলিশ বিধায়কের ছায়া মাড়াতেও যেন ভয় পাচ্ছে। কমিশনের নির্দেশের ২৪ ঘণ্টা পরও যখন এফআইআর (FIR) হয় না, তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে— "বিধায়ক কি আইনের ঊর্ধ্বে?" সাধারণ মানুষ আজ বিডিও অফিস বা ভোটকেন্দ্রে যেতে ভয় পাচ্ছেন। মনিরুলের এই দাপট আসলে সাধারণ ভোটারদের মনে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, "ভোটের আগে লাঠি আমাদের হাতেই থাকবে।"
'ক্ষমা প্রার্থনা
চাপে পড়ে বিধায়ক ক্ষমা চেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে সেই ভয় রয়েই গেছে। বিরোধীদের দাবি, "মনিরুল ইসলাম বরাবরই হুমকির রাজনীতিতে অভ্যস্ত। লবপুর থেকে ফরাক্কা— তিনি যেখানেই যান, দাপট আর পেশিবলই তাঁর মূল হাতিয়ার।" আজ যখন তিনি মুখে সংবিধানের কথা বলছেন, তখন মানুষ ভাবছেন তাঁর সেই লাঠির কথা, যা দিয়ে তিনি কমিশনের 'কোমর ভাঙতে' চেয়েছিলেন।
মনিরুল ইসলামের এই বিতর্ক শুধুমাত্র একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি পশ্চিমবঙ্গের সেই দীর্ঘস্থায়ী রোগের লক্ষণ, যেখানে রাজনৈতিক স্বার্থে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে পদাঘাত করা হয়। ফরাক্কার মানুষ আজ শান্তিতে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চান, কিন্তু মনিরুল ইসলামের মতো নেতাদের দাপট সেই শান্তিতে বড়সড় আশঙ্কার মেঘ তৈরি করেছে।



