নিজস্ব প্রতিবেদক |
আজ ২৩শে জানুয়ারি। ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি তারিখ মাত্র নয়, বরং এক জাতির আবেগ, সাহস আর দীর্ঘশ্বাসের মিলনস্থল। আজ সেই মহামানবের ১২৯তম জন্মতিথি, যিনি শিখিয়েছিলেন মেরুদণ্ড সোজা করে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে। তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।
ভারতের মাটির প্রতিটি ধূলিকণা আজ যেন তাঁর সেই বজ্রকণ্ঠের প্রতিধ্বনি করছে— "তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব!" কিন্তু আজ একশ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসে প্রশ্ন জাগে, দেশ তাঁকে রক্ত দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে আমরা কি তাঁকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিতে পেরেছি?
তিল তিল করে গড়ে তোলা সংগ্রাম:
কটকের সেই মেধাবী ছাত্রটি, যিনি অনায়াসেই আইসিএস (ICS) অফিসার হয়ে ব্রিটিশ সরকারের আয়েশ আর বিলাসিতায় জীবন কাটাতে পারতেন, তিনি বেছে নিয়েছিলেন কণ্টকাকীর্ণ পথ। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ দেশমাতৃকার চোখের জল তাঁকে স্থির থাকতে দেয়নি। গান্ধীজির অহিংস নীতির প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও, সুভাষের রক্তে ফুটছিল বিপ্লবের আগুন। তিনি বুঝেছিলেন, ব্রিটিশের দয়া নয়, দরকার অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার জেদ।
গৃহবন্দিত্ব থেকে মহানিষ্ক্রমণ:
১৯৪১ সালের সেই শীতের রাত। এলগিন রোডের বাড়ি থেকে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দিয়ে যখন তিনি 'মহানিষ্ক্রমণে' বেরোলেন, সেটি কেবল এক ব্যক্তির পলায়ন ছিল না; সেটি ছিল একটি জাতির মুক্তির সংকল্প। কাবুল থেকে বার্লিন, আর বার্লিন থেকে ডুবোজাহাজে করে সিঙ্গাপুর— মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তাঁর লক্ষ্য ছিল স্থির। গড়ে তুললেন 'আজাদ হিন্দ ফৌজ'। ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের চোখে তিনি এঁকে দিলেন দিল্লীর লাল কেল্লায় তেরঙা ওড়ানোর স্বপ্ন।
একটি অমীমাংসিত হাহাকার:
১৯৪৫ সালের ১৮ই আগস্ট। তাইহোকু বিমানবন্দর। সরকারি নথিতে বলা হয়, এক বিমান দুর্ঘটনায় পুড়ে শেষ হয়ে গিয়েছিলেন বাঙালির তথা ভারতের এই মহানায়ক। কিন্তু ভারতবাসীর হৃদয় আজও তা মানতে নারাজ। এই মৃত্যুসংবাদ কি সত্য ছিল, নাকি ছিল কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র? রেনকোজি মন্দিরে রাখা চিতাভস্ম কি সত্যিই সুভাষের? শাহনওয়াজ কমিটি থেকে মুখার্জি কমিশন— তদন্ত হয়েছে অনেক, কিন্তু উত্তর মেলেনি। আজও বাঙালির ড্রয়িংরুমের আলোচনায় তিনি বেঁচে আছেন ‘গুমনামি বাবা’ হয়ে, কিংবা সুদূর সাইবেরিয়ার কোনো বন্দিশিবিরে প্রতীক্ষারত এক যোদ্ধা হিসেবে।
আজকের দিনে নেতাজির প্রাসঙ্গিকতা:
আজ যখন দেশ সাম্প্রদায়িকতা কিংবা বিভেদের সম্মুখীন হয়, তখন সবথেকে বেশি মনে পড়ে সেই মানুষটিকে, যাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল। তাঁর কাছে ধর্ম ছিল ব্যক্তিগত, কিন্তু দেশ ছিল পরম।
আজকের এই 'পরাক্রম দিবসে' দাঁড়িয়ে আমাদের প্রাপ্তি শুধু তাঁর মূর্তিতে মাল্যদান নয়। আজ যখন ভারতের সীমান্তে কোনো জওয়ান বুক চিতিয়ে দাঁড়ান, কিংবা কোনো সাধারণ মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন, বুঝে নিতে হবে নেতাজি আজও বেঁচে আছেন।
সুভাষচন্দ্র বসু কোনো মৃত ইতিহাস নন; তিনি এক চিরন্তন বহ্নিশিখা। যে শিখা পরাধীন ভারতের অন্ধকার ঘুচিয়েছিল এবং আজও প্রতিটি দেশপ্রেমিক ভারতীয়র হৃদয়ে দেশভক্তির মশাল জ্বালিয়ে রাখে।
হে মহানায়ক, এই অভাগা জাতি আজও তোমার ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে আছে। জয় হিন্দ!



