বিশেষ প্রতিবেদন | ৬ জানুয়ারি, ২০২৬
ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালত কক্ষটি আজ কোনো সাধারণ অপরাধীর বিচারের সাক্ষী ছিল না। সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন এক লড়াকু রাষ্ট্রনায়ক, যার শরীরে জেলের নীল ইউনিফর্ম আর পায়ে ছিল ডান্ডাবেড়ি। গত শনিবার কারাকাসের নিজ বাসভবন থেকে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর এক অতর্কিত ও রক্তক্ষয়ী অভিযানে 'অপহৃত' হওয়ার পর, আজ প্রথমবারের মতো বিশ্বের সামনে এলেন নিকোলাস মাদুরো।
শুনানির শুরুতে বিচারক আলভিন হেলারস্টেইন যখন মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসবাদ ও কোকেন পাচারের মতো সাজানো অভিযোগগুলো পাঠ করছিলেন, তখন ৬৩ বছর বয়সী এই নেতা মাথা উঁচু করে দাঁড়ান। স্প্যানিশ ভাষায় দরাজ কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেন:
"আমি নির্দোষ। আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমি একজন সজ্জন ব্যক্তি এবং আমি আজও আমার দেশের বৈধ প্রেসিডেন্ট। আমাকে অন্যায়ভাবে অপহরণ করে আনা হয়েছে, আমি একজন যুদ্ধবন্দি (Prisoner of War)!"
আহত স্ত্রীর আর্তি: মানবিকতা যখন লুণ্ঠিত
মাদুরোর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। বন্দি অবস্থায় তার চোখের নিচের ফোলা অংশ এবং কপালের ব্যান্ডেজ স্পষ্ট বলে দিচ্ছিল, আটকের সময় মার্কিন বাহিনী কতটা নৃশংস ছিল। ফ্লোরেসের আইনজীবী মার্ক ডনেলি আদালতে জানান, অভিযানে সিলিয়ার পাজরের হাড় ভেঙে গেছে বা গুরুতর আঘাত লেগেছে। কিন্তু শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও তার কণ্ঠে ছিল আত্মমর্যাদার সুর। তিনিও নিজেকে "সম্পূর্ণ নির্দোষ" দাবি করেন।
সত্যের সৈনিক যখন আইনি ঢাল: অ্যাসাঞ্জের আইনজীবী পোল্যাক
মাদুরোর এই অসম লড়াইয়ে কাণ্ডারি হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন বিশ্বখ্যাত আইনজীবী ব্যারি পোল্যাক।
পোল্যাক আদালতে সাফ বলেন, "এটি কোনো সাধারণ গ্রেপ্তার নয়, এটি একটি সামরিক অপহরণ।" তিনি মাদুরোর 'Head-of-State Immunity' বা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়মুক্তির দাবি তুলবেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
পর্দার আড়ালে তেলের রাজনীতি
মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা মাদক পাচারের অভিযোগকে অনেক বিশ্লেষক কেবলই একটি 'অজুহাত' হিসেবে দেখছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য—"আমরাই এখন ভেনেজুয়েলা নিয়ন্ত্রণ করছি"—প্রমাণ করে যে, লক্ষ্য মাদুরো নন, লক্ষ্য হলো ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদ। বামপন্থী দলগুলোর অভিযোগ, মার্কিন প্রশাসন এই অভিযানের মাধ্যমে ল্যাটিন আমেরিকায় তাদের হারানো আধিপত্য ফিরে পেতে চাইছে।
মামলার মূল পয়েন্টগুলো:
চার্জ: নারকো-সন্ত্রাসবাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রে টন টন কোকেন পাঠানোর ষড়যন্ত্র।
পরবর্তী শুনানি: ১৭ মার্চ, ২০২৬।
আদালতের বাইরে: নিউইয়র্কের রাস্তায় মাদুরো সমর্থক এবং বিরোধীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি স্লোগান।
ইতিহাসের বিচার
আদালত থেকে বের হওয়ার সময় মাদুরো যখন সাংবাদিকদের দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে "হ্যাপি নিউ ইয়ার" বলছিলেন, তখন তার চোখে মুখে পরাজয়ের চিহ্ন ছিল না। বরং ছিল এক অবাধ্য বিদ্রোহের আভা। আগামী ১৭ মার্চ পর্যন্ত তাকে রাখা হবে ব্রুকলিনের সেই কারাগারে, যেখানে এক সময় এল চ্যাপোর মতো অপরাধীদের রাখা হয়েছিল।
কিন্তু বিশ্ববাসী আজ ভাবছে—একটি স্বাধীন দেশের প্রেসিডেন্টকে এভাবে শিকল পরিয়ে কি আসলে কোনো বিচার হচ্ছে, নাকি একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রের নামে চলছে নব্য উপনিবেশবাদ?


