নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে রাজ্য সরকার বিধানসভায় যে ‘ভোট অন অ্যাকাউন্ট’ বা অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করেছে, তাকে কার্যত ‘নির্বাচনী ইস্তাহার’ এবং ‘প্রতারণার দলিল’ বলে নস্যাৎ করে দিল সিপিআইএম। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় বাজেট পেশের পরই বাম নেতৃত্বের অভিযোগ, ঋণের ভারে জর্জরিত রাজ্যকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে শুধুমাত্র ভোটের ফায়দা লুটতে পাইকারি হারে ভাতার ঘোষণা করা হয়েছে, যার সঙ্গে বাস্তব অর্থনীতির কোনো যোগ নেই।
‘ভিক্ষা নয়, কাজ চাই’
বাজেটে ‘বাংলার যুব সাথী’ প্রকল্পের আওতায় কর্মহীন যুবক-যুবতীদের মাসে ১৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে রাজ্য। এই ঘোষণাকে তীব্র কটাক্ষ করেছেন সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তাঁর কথায়, “রাজ্যের যুবসমাজ ভিক্ষা চায় না, তারা কাজ চায়। গত দেড় দশকে রাজ্যে নতুন শিল্প আসেনি, সরকারি দপ্তরে লাখ লাখ শূন্যপদ পড়ে আছে, নিয়োগ দুর্নীতির গহ্বরে তলিয়ে গেছে মেধা। এখন ভোটের মুখে দেড় হাজার টাকার ললিপপ দেখিয়ে সরকার যুবকদের ক্ষোভ প্রশমন করতে চাইছে। এটা বেকার যুবক-যুবতীদের আত্মসম্মানে আঘাত।”
ডিএ নিয়ে ‘উপহাস’
রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য বাজেটে আরও ৪ শতাংশ ডিএ (DA) বৃদ্ধির ঘোষণা করা হয়েছে। একে সরকারি কর্মচারীদের প্রতি ‘নিষ্ঠুর উপহাস’ বলে দাগিয়ে দিয়েছে বামপন্থী কর্মচারী সংগঠনগুলি। বাম পরিষদীয় দলের বক্তব্য, যেখানে কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘ ভাতার দাবি আদায়ে কর্মচারীরা লাগাতার আন্দোলন করছেন এবং বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন, সেখানে বকেয়া ৩৬ শতাংশের (কেন্দ্রীয় হারের সাপেক্ষে) বিশাল ফারাক না কমিয়ে মাত্র ৪ শতাংশ বৃদ্ধি করে সরকার ভিক্ষা দেওয়ার মানসিকতা দেখাচ্ছে।
ঋণের ফাঁদে বাংলা
বাম অর্থনীতিবিদদের দাবি, এই বাজেট রাজ্যের অর্থনীতিকে আরও দেউলিয়া করে দেবে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সহ বিভিন্ন প্রকল্পে ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হলেও, আয়ের কোনো নতুন উৎসের দিশা বাজেটে নেই। সিপিআইএম নেতৃত্বের অভিযোগ, “রাজ্যের ঘাড়ে প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝা। এই বাজেটের ফলে সেই বোঝা আরও বাড়বে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের পাহাড় চাপিয়ে দিয়ে, জিএসটি এবং মদের ওপর নির্ভর করে সরকার চালাচ্ছে তৃণমূল।”
শিল্প ও কৃষি অবহেলিত
বামফ্রন্টের অভিযোগ, বাজেটে উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন বা চা বাগানের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) নিয়ে বড় বড় কথা বলা হলেও, বাস্তবে বিদ্যুতের চড়া দাম এবং তোলাবাজির জেরে রাজ্যে শিল্প ধুঁকছে। কৃষকদের ফসলের ন্যায্য দাম বা হিমঘর তৈরি নিয়ে বাজেটে কোনো বরাদ্দ নেই বলে অভিযোগ করেছে তারা।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, সিপিআইএমের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের এই বাজেট কোনো দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের রূপরেখা নয়, বরং আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বৈতরণী পার হওয়ার জন্য জনমোহিনী প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি মাত্র। বামেদের হুঁশিয়ারি, “ভাতার রাজনীতি করে মানুষের চোখ আর বেশিদিন রাঙানো যাবে না, মানুষ এবার অধিকার ও কাজের দাবিতেই ভোট দেবে।”