লন্ডন, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ – ব্রিটিশ রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে উন্মোচিত হয়েছে জেফরি এপস্টাইন সংক্রান্ত নতুন কিছু গোপন নথি। এই ফাইলগুলোতে আমেরিকার সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসন এবং কুখ্যাত শিশু যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের মধ্যে অত্যন্ত আপত্তিকর এবং ঘনিষ্ঠ ইমেল আদান-প্রদানের প্রমাণ মিলেছে। ২০০৯ সালের জুলাই মাসের এই নথিপত্রগুলো এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন সাধারণ মানুষের মধ্যে অভিজাত শ্রেণির দায়মুক্তি নিয়ে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
আপত্তিকর ইমেল ও নির্লজ্জ রসিকতা
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত প্রায় ৩০ লক্ষ পৃষ্ঠার এই বিশালাকার নথিতে দেখা গেছে, ম্যান্ডেলসন—যিনি লেবার পার্টির একজন প্রভাবশালী নেতা এবং টনি ব্লেয়ারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী—এপস্টাইনের সঙ্গে অত্যন্ত সখ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন। ২০০৯ সালে নাবালিকাকে যৌন ব্যবসায় বাধ্য করার অপরাধে ১৩ মাসের জেল খেটে বের হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই ম্যান্ডেলসন এপস্টাইনকে ইমেল করেন।
একটি বিনিময়ে ম্যান্ডেলসন কারামুক্তির পর এপস্টাইনের "স্বাধীনতা" নিয়ে জানতে চান। এর উত্তরে এপস্টাইন একটি অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ এবং যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে বলেন, "She feels fresh, firm and creamy." এর জবাবে ম্যান্ডেলসন তাকে ধমক দেওয়ার বদলে প্রশ্রয় দিয়ে লেখেন, "Naughty boy." ভুক্তভোগীদের প্রতি চরম অবমাননাকর এই ধরণের রসিকতা ম্যান্ডেলসনের নৈতিক অবস্থানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
জনরোষ ও সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ
এই তথ্য ফাঁসের পর সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এক্স (সাবেক টুইটার) ব্যবহারকারীরা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলছেন, সাধারণ মানুষ ছোট অপরাধে কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হলেও, এই ধরণের প্রভাবশালীরা দিব্যি পার পেয়ে যান। অনেক ব্যবহারকারী এমনকি মানবতার খাতিরে এই অপরাধচক্রের সাথে যুক্ত সবার কঠোরতম শাস্তির দাবি তুলেছেন।
জনগণের এই তীব্র ক্ষোভের মুখে বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এপস্টাইনের ভুক্তভোগীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেন, "আপনাদের সাথে যা করা হয়েছে তার জন্য আমি দুঃখিত। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এত মানুষ আপনাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে দেখে আমি লজ্জিত।" উল্লেখ্য, বিতর্ক দানা বাঁধার পর গত সেপ্টেম্বর মাসেই ম্যান্ডেলসনকে রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
আর্থিক লেনদেন ও তদন্ত
নথিতে কেবল ব্যক্তিগত আলাপচারিতাই নয়, বরং সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের তথ্যও উঠে এসেছে। জানা গেছে:
২০০৩ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে ম্যান্ডেলসনের সাথে যুক্ত অ্যাকাউন্টে এপস্টাইন ৭৫,০০০ ডলার পাঠিয়েছিলেন।
২০০৯-২০১০ সালের মধ্যে আরও অর্থ লেনদেন হয়, যার মধ্যে ম্যান্ডেলসনের স্বামীর পড়াশোনার খরচের জন্য ১০,০০০ পাউন্ড অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অভিযোগ উঠেছে যে, ২০০৯ সালে বিজনেস সেক্রেটারি থাকাকালীন ম্যান্ডেলসন ব্রিটেনের অর্থনীতি সংক্রান্ত কিছু সংবেদনশীল তথ্যও এপস্টাইনকে দিয়েছিলেন।
এই গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে মেট্রোপলিটন পুলিশ বর্তমানে ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ তিনি লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এপস্টাইন কেলেঙ্কারি কেবল ব্যক্তিগত অপরাধের বিষয় নয়, বরং এটি ক্ষমতার দাপটে গড়ে ওঠা এক অসুস্থ সংস্কৃতির প্রতিফলন। ভুক্তভোগীদের আইনজীবীরা বলছেন, ম্যান্ডেলসনের মতো প্রভাবশালীরা লাল সংকেত থাকা সত্ত্বেও এপস্টাইনের সাথে সম্পর্ক রেখে প্রকারান্তরে এই অপরাধগুলোকেই সমর্থন দিয়েছেন। এখন ব্রিটিশ সমাজ এবং সংসদ থেকে একটাই দাবি উঠছে—অভিজাত শ্রেণির এই দায়মুক্তির অবসান ঘটিয়ে অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।


