আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর চলমান সামরিক অভিযান ও গণহত্যার প্রকৃত ভয়াবহতা নিয়ে এক বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী চিকিৎসা সাময়িকী 'দ্য ল্যানসেট' (The Lancet)। বুধবার প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছে, দুই বছর ব্যাপী এই গণহত্যার প্রথম ১৬ মাসেই অন্তত ৭৫,২০০ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
এই সংখ্যাটি সেই সময়ে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ঘোষিত সরকারি নিহতের হিসাবের চেয়ে অন্তত ২৫,০০০ বেশি। গবেষকদের মতে, গাজার প্রকৃত পরিস্থিতি সরকারি নথির চেয়েও অনেক বেশি সংকটাপন্ন।
পরিসংখ্যানের আড়ালে মানবিক বিপর্যয়
ল্যানসেটের এই গবেষণায় মূলত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কালকে বিবেচনা করা হয়েছে। গবেষণার প্রধান দিকগুলো হলো:
সহিংস মৃত্যু: সরাসরি বোমা হামলা, গুলি ও সামরিক অভিযানে মারা গেছেন প্রায় ৭৫,২০০ জন।
নারী ও শিশুর হার: মোট নিহতের প্রায় ৫৬ শতাংশই নারী ও শিশু। এর মধ্যে অন্তত ২২,৮০০ জনই শিশু বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
পরোক্ষ মৃত্যু: যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, মহামারি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে আরও প্রায় ১৬,৩০০ জন অকালমৃত্যুর শিকার হয়েছেন।
কেন সরকারি হিসাবের চেয়ে নিহতের সংখ্যা বেশি?
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যকে ইসরায়েল ও কিছু পশ্চিমা দেশ শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। তবে ল্যানসেটের গবেষকরা বলছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য মূলত 'সংরক্ষণশীল' বা প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম ছিল। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:
ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ: হাজার হাজার মানুষ বিধ্বস্ত ভবনের নিচে চাপা পড়ে আছেন। উদ্ধারকারী দলের অভাবে তাদের বের করা সম্ভব হয়নি, ফলে তারা সরকারি তালিকায় স্থান পাননি।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধস: গাজার অধিকাংশ হাসপাতাল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এবং প্রশাসনিক চেইন ভেঙে পড়ায় প্রতিটি মৃত্যুর তথ্য যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
গণকবর ও পরিচয়হীন মরদেহ: যুদ্ধের তীব্রতায় বহু মানুষকে পরিচয় শনাক্ত ছাড়াই গণকবরে দাফন করতে হয়েছে।
"মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘ হতে পারে"
লন্ডনের রয়্যাল হলোওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ এবং এই গবেষণার অন্যতম লেখক মাইকেল স্প্যাগাট বলেন, "গবেষণার তথ্য প্রমাণ করে যে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সর্বোচ্চ নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আমাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি ৩০ জন গাজাবাসীর মধ্যে ১ জন সরাসরি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।"
গবেষণাটি আরও সতর্ক করেছে যে, দীর্ঘমেয়াদী অবরোধ, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং চরম খাদ্য সংকটের ফলে গাজায় পরোক্ষ মৃত্যুর হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ২০২৪ সালের আগস্টেই জাতিসংঘ গাজায় 'দুর্ভিক্ষ' পরিস্থিতির ঘোষণা দিয়েছিল, যা বর্তমানে এক চরম শিখরে পৌঁছেছে।
আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলার বিচার চলাকালে ল্যানসেটের এই প্রতিবেদনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে এটি কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং একটি জনপদকে পদ্ধতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া।
গাজায় এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় রোধে এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে গবেষক দলটি।


