নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও দুর্গাপুর: কর্মসংস্থানের অভাব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলোর (Self-Help Groups) বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ। এমন পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারের “বাংলার যুবসাথী” (Jubo Sathi) প্রকল্প এক মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে এই প্রকল্প ঘিরে বেকার যুবক-যুবতীদের মধ্যে আশার আলো দেখা গেলেও, অন্যদিকে এর প্রতি বিপুল সংখ্যক মানুষের নির্ভরতা রাজ্যের গভীর অর্থনৈতিক বিপন্নতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। মাত্র প্রথম দু'দিনেই (১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি) এই প্রকল্পে ১৩.৫২ লক্ষের বেশি আবেদন জমা পড়েছে, যা এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।
রাজ্যজুড়ে ‘যুবসাথী’ প্রকল্পে উপচে পড়া ভিড়
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া “বাংলার যুবসাথী” প্রকল্পে ১৫০০ টাকা মাসিক ভাতার আশায় রাজ্যজুড়ে বেকার যুবক-যুবতীরা ভিড় করছেন কর্মসংস্থান কেন্দ্রগুলোতে (Employment Bank)। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এনরোলমেন্ট শুরু হওয়ার পর:
প্রথম দিন (১৫ ফেব্রুয়ারি): ৭৬৯টি ক্যাম্পে ৬.২৯ লক্ষ মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন, যার মধ্যে ৫.৫ লক্ষ আবেদন যুবসাথীর জন্য জমা পড়ে।
দ্বিতীয় দিন (১৬ ফেব্রুয়ারি): Swanirbhar Bangla ক্যাম্প এবং অনলাইন পোর্টাল (apas.wb.gov.in) মিলিয়ে মোট ১৩.৫২ লক্ষেরও বেশি আবেদন জমা পড়ে।
সাম্প্রতিক আপডেট (২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত): যদিও ১৭ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারির সর্বশেষ সংখ্যা সরকারিভাবে আপডেট করা হয়নি, তবে প্রতিদিন গড়ে ৬-৭ লক্ষ নতুন আবেদন আসার প্রবণতা দেখে অনুমান করা হচ্ছে যে, ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট আবেদনকারীর সংখ্যা ২০ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। আবেদন প্রক্রিয়া আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে এবং হিট রেকর্ড ভাঙার গতিতে চলছে।
এই ব্যাপক জনসমাগম স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কাজের অভাবে রাজ্যের যুবসমাজ একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে।
ভেঙে পড়া স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও গ্রামীণ অর্থনীতির সংকট
একসময় স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলো বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে:
ঋণের বোঝা ও বাজারজাতকরণের অভাব: ব্যাংক ঋণের জটিলতা এবং উৎপাদিত পণ্যের জন্য সঠিক বাজারের অভাবে বহু স্বনির্ভর গোষ্ঠী ঋণের বোঝায় জর্জরিত।
কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি: কাঁচামালের দাম বাড়লেও উৎপাদিত পণ্যের সঠিক দাম না পাওয়ায় গোষ্ঠীগুলোর লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকারি সহায়তার অভাব: আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং উন্নত বিপণন ব্যবস্থার অভাবে অনেক গোষ্ঠীই বর্তমানে বন্ধ হওয়ার মুখে।
এই গ্রামীণ মন্দা বেকারত্বের সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে যুবকরা সরকারি ভাতার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
পশ্চিম বর্ধমান ও দুর্গাপুরের বিশেষ চিত্র: ভিড়ের তোড় ও স্থানীয় আবেদন চিত্র
শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত পশ্চিম বর্ধমান জেলাতেও 'যুবসাথী' প্রকল্পের প্রতি বিপুল সাড়া দেখা গেছে। প্রথম দু'দিনেই (১৫-১৬ ফেব্রুয়ারি) পশ্চিম বর্ধমান জেলায় ৫৬,৮৩০টিরও বেশি আবেদন জমা পড়েছে, যা জেলার মোট আবেদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
আসানসোল এলাকার সর্বোচ্চ আবেদন: আসানসোল মিউনিসিপ্যালিটির রানিগঞ্জ, জামুড়িয়া, আসানসোল দক্ষিণ/উত্তর এবং কুলটিতে মোট ২৮,৬১২টি আবেদন জমা পড়েছে, যা জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ।
দুর্গাপুরের চিত্র: দুর্গাপুর পূর্ব বিধানসভা এলাকা থেকে প্রথম দু'দিনে ২,০৩৯টি আবেদন এসেছে। দুর্গাপুরের ভগৎ সিং স্টেডিয়াম চত্বরসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে থিকথিকে ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় সূত্রমতে, ২০ ফেব্রুয়ারি নাগাদ পশ্চিম বর্ধমান জেলায় মোট আবেদন ৭০,০০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যান্য এলাকার আবেদন (প্রথম দু'দিন): অন্ডালে ৩,৯৪৩টি, বারাবনিতে ৩,৩৮৩টি, এবং পাণ্ডবেশ্বরে ২,২৯৮টি আবেদন জমা পড়েছে।
এই চিত্র স্পষ্ট করে যে, শিল্পাঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিম বর্ধমানে কর্মসংস্থানের অভাব তীব্র। বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ভাতার সুবিধা নিতে যুবকরা বিশেষভাবে আগ্রহী।
আর্থিক স্থবিরতা থেকে উত্তরণের পথ কি?
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, 'যুবসাথী' প্রকল্পে এই বিপুল সংখ্যক আবেদন রাজ্যের অর্থনৈতিক স্থবিরতারই প্রতিফলন। তবে এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ: নতুন শিল্প স্থাপন এবং মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প (MSME) প্রসারিত করার মাধ্যমে প্রকৃত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
দক্ষতা বৃদ্ধি: প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়ে যুবকদের কর্মোপযোগী করে তোলা।
স্বনির্ভর গোষ্ঠীর পুনরুজ্জীবন: স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলোকে আধুনিক প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ এবং বাজার সংযোগের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করা।
আবেদনকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
আবেদনের শেষ তারিখ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
আবেদনের স্থান: স্থানীয় ব্লক অফিস বা দুয়ারে সরকার ক্যাম্প (সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা)।
প্রয়োজনীয় নথি: আধার কার্ড, ব্যাঙ্ক পাসবুক এবং মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট।
আবেদনের স্থিতি: আবেদনকারীরা
apas.wb.gov.inবাbanglaryuvasathi.gov.in-এ তাদের একনলেজমেন্ট নম্বর দিয়ে আবেদনের স্থিতি যাচাই করতে পারবেন।
‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্প সাময়িকভাবে বেকারত্বের চাপ কমাতে সাহায্য করলেও, এর প্রতি ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। কেবল ভাতা প্রদান নয়, দীর্ঘমেয়াদী কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্বনির্ভরতার পথ সুগম করার মাধ্যমেই বাংলার যুবসমাজ প্রকৃত অর্থে উন্নত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।


