নিজস্ব প্রতিবেদক | ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
আজ ২১ ফেব্রুয়ারি। বাঙালি জাতির কাছে এটি যেমন মহান মাতৃভাষা দিবস, বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এই দিনটি তেমনি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা লগ্ন। ১৮৪৮ সালের এই দিনে লন্ডনের এক ছোট ছাপাখানা থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ (কমিউনিস্ট ইশতেহার)। সেই ঐতিহাসিক ক্ষণটিকে স্মরণ করে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘রেড বুকস ডে’ বা ‘লাল বই দিবস’।
বিগত কয়েক বছর ধরে প্রগতিশীল লেখক, প্রকাশক এবং পাঠকদের উদ্যোগে এই দিনটি আন্তর্জাতিক স্তরে একটি বড় সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
রেড বুকস ডে-র ইতিহাস ও তাৎপর্য
২০২০ সালে ভারতের 'লেফটওয়ার্ড বুকস' এবং অন্যান্য প্রগতিশীল প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সম্মিলিত আহ্বানে এই দিবসের সূচনা হয়। মূলত দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, মুক্তচিন্তার ওপর আঘাত এবং যুক্তিবাদের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে একটি 'সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ' গড়ে তোলাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।
আয়োজকদের মতে, এটি কেবল বই পড়ার দিন নয়, বরং এটি ‘আইডিয়ার লড়াই’ (Battle of Ideas)। যখন সারা বিশ্বে সাম্প্রদায়িকতা এবং অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তখন মানুষের মুক্তির কথা বলা সাহিত্যকে সাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই দিবসের উদ্দেশ্য।
কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো: ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনকারী দলিল
কার্ল মার্কস এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের যৌথ প্রচেষ্টায় লিখিত এই ইশতেহারটি মূলত তৎকালীন 'কমিউনিস্ট লীগ'-এর কর্মসূচি হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল। এর মূল বক্তব্যগুলো আজও সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের কাছে গবেষণার বিষয়:
১. শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস
ইশতেহারের শুরুতেই বলা হয়েছে— “এ যাবতকালের বিদ্যমান সকল সমাজের ইতিহাস হলো শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস।” মার্কস দেখিয়েছেন যে, সমাজে সবসময় দুটি পক্ষ থাকে: যারা উৎপাদনের উপায়ের মালিক (বুর্জোয়া) এবং যারা নিজেদের শ্রম বিক্রি করে (সর্বহারা)। এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্বই সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
২. পুঁজিবাদের সংকট
ম্যানিফেস্টোতে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল যে, পুঁজিবাদ তার নিজের মুনাফার তাগিদেই বারবার সংকটে পড়বে এবং এমন এক শ্রমিক শ্রেণি তৈরি করবে যারা শেষ পর্যন্ত এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাবে।
৩. ব্যক্তিগত মালিকানা ও মুক্তি
মার্কস স্পষ্ট করেছিলেন যে, তিনি সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য জিনিসের মালিকানা কাড়তে চান না, বরং তিনি সেই 'ব্যক্তিগত মালিকানা' (যেমন কারখানা, জমি) বিলুপ্ত করতে চান যা দিয়ে অন্য মানুষকে শোষণ করা হয়।
ম্যানিফেস্টোর ১০টি মূল দাবি (সংক্ষেপে)
ইশতেহারের দ্বিতীয় অধ্যায়ে একটি ১০ দফার কর্মসূচি দেওয়া হয়েছিল, যার অনেকগুলোই আজ আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি:
জমির মালিকানা উচ্ছেদ।
প্রগতিশীল আয়কর (যত বেশি আয়, তত বেশি ট্যাক্স)।
উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির অধিকার বাতিল।
ঋণ ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা।
যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় আনা।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কারখানার বিস্তার।
সকলের জন্য কাজের সমান বাধ্যবাধকতা।
কৃষি ও শিল্পের সমন্বয়।
শহর ও গ্রামের ব্যবধান দূর করা।
সকল শিশুর জন্য অবৈতনিক সরকারি শিক্ষা এবং শিশুশ্রম বন্ধ।
২০২৬ সালের উদযাপন ও কর্মসূচি
এ বছর ‘রেড বুকস ডে’ উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে:
কেরালা ও তামিলনাড়ু: ভারতের এই দুই রাজ্যে কয়েক লক্ষ মানুষ আজ রাস্তায় নেমে গণপাঠ (Public Reading) কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। বিশেষ করে মালয়ালম ও তামিল ভাষায় অনূদিত ম্যানিফেস্টো বিলি করা হচ্ছে।
লাতিন আমেরিকা: ব্রাজিল ও ভেনেজুয়েলায় বামপন্থী কর্মীরা আজ বই মেলা ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছেন।
ম্যালকম এক্স ও লাল বই দিবস: ২১ ফেব্রুয়ারি মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলনের নেতা ম্যালকম এক্স-এর শাহাদাত বার্ষিকী। তাই অনেক দেশে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই এবং বর্ণবাদবিরোধী লড়াইকে একসূত্রে গেঁথে এই দিবস পালন করা হচ্ছে।
১৭৭ বছর আগে যে ‘লাল বই’ বা ইশতেহারটি প্রকাশিত হয়েছিল, তার প্রতিটি শব্দ আজও শোষিত মানুষের মনে আশার আলো জাগায়। আজকের রেড বুকস ডে প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির এই যুগেও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং বৈপ্লবিক সাহিত্যের আবেদন ফুরিয়ে যায়নি।
“দুনিয়ার মজদুর, এক হও!”—এই অমর আহ্বান আজও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বিশ্বের অলিতে-গলিতে।

.png)
.png)
.png)
.png)
.png)
.png)
.png)
.png)
.png)
